গরমের ছুটি জমিয়ে দেবে টিম একেন
ছবি: দ্য একেন—বেনারসে বিভীষিকা
পরিচালনা: জয়দীপ মুখোপাধ্যায়
অভিনয়ে: অনির্বাণ চক্রবর্তী, সুহোত্র মুখোপাধ্যায়, সোমক ঘোষ, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, গৌরব চক্রবর্তী, ইশা সাহা, বিশ্বনাথ বসু, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, ঋষভ বসু, সাগ্নিক চট্টোপাধ্যায়
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট
RBN রেটিং ★★★★★★★☆☆☆
কয়েকদিন আগে পর্যন্তও বছরভর বাঙালি অপেক্ষায় থাকত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই গোয়েন্দার ছবি মুক্তির আশায়। কারণ দীর্ঘকায়, প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী, বুদ্ধিমান, সুচতুর, গম্ভীর, স্বল্পবাক ও সংযত গোয়েন্দা পুরুষ বাঙালির বরাবরের পছন্দ। কিন্তু বছর চারেক ধরে এর মধ্যে কেমন করে যেন ঢুকে পড়েছেন উচ্চতায় খাটো, স্বভাবে হালকা, কিঞ্চিৎ বোকা ধরনের, ক্রমাগত বাজে বকা এক বাঙালি গোয়েন্দা। সাহিত্যেও ইনি তেমন পরিচিত ছিলেন না। আশ্চর্যের কথা হলো, শুরুতে সেভাবে গুরুত্ব না দিলেও যত দিন যাচ্ছে একেন্দ্র সেনকে যেন আর এড়ানো যাচ্ছে না। বাচ্চা থেকে বুড়ো, গেরস্থ থেকে কর্পোরেট, সকলেই ক্রমশ একেনের অনুরাগী হয়ে উঠছে। না হলে শেষ কবে তারকা অভিনেতা না থাকা সত্ত্বেও শুক্রবার রাত সোয়া দশটার শো-এ নিউ টাউনে প্রায় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ দেখা গিয়েছে মনে করা মুশকিল।
আরও পড়ুন: রাজ কপূরের বাড়িতে সিমিকে দেখে পছন্দ করেন সত্যজিৎ রায়
একেনের এ হেন জনপ্রিয়তার কারণ কি শুধুই হাস্যরস? অবশ্যই হাস্যরস একটা বড় কারণ, কিন্তু তার সঙ্গে যে তিনটি ফ্যাক্টর বা মাথা এই চরিত্রকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তাকে অনায়াসে একেনের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বলা যেতে পারে। এই তিনটি ফ্যাক্টর অবশ্যই পদ্মনাভ দাশগুপ্তর চিত্রনাট্য, জয়দীপের পরিচালনা এবং নিশ্চিতভাবে অনির্বাণের অভিনয়। দেশে জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে আতঙ্ক যে জায়গায় পৌঁছেছে সেখানে স্রেফ হাসতে-হাসতে এমন একটা কেসের সমাধান করে ফেলা বোধহয় একমাত্র একেনের নিজস্ব কায়দাতেই সম্ভব।
‘দ্য একেন—বেনারসে বিভীষিকা’ (The Eken—Benaras e Bibhishika) ছবির গল্পটা একটু জেনে নেওয়া যাক।
কাশীতে বেড়ে চলেছে সন্ত্রাস। বেলাল মালিকের (শাশ্বত) মতো সন্ত্রাসীকে সাহায্য করছে স্থানীয় ব্যবসায়ী সুখদেও (বিশ্বনাথ)। বেলালের কারণে বেনারসে ঘটে গিয়েছে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণও। সে অত্যন্ত ধূর্ত ও ছদ্মবেশে সিদ্ধহস্ত এক জঙ্গি। মুজাহিদিন গোষ্ঠীর ওপর ভারত সরকারের হামলা এবং তার সতীর্থদের মৃত্যুর বদলা নিতে সে বড় হামলার ছক কষতে থাকে। এই অবস্থায় বন্ধু সুবিমলের (গৌরব) আমন্ত্রণে বেনারসে বেড়াতে আসে প্রমথ। সঙ্গে অবশ্যই বাপি ও একেন। এখানে এসে আলাপ হয় সুবিমলের অসুস্থ কাকা বীরেশ্বর (দেবেশ), নতুন কাকিমা দামিনী (ইশা) ও কাকার অ্যাকাউন্টেন্ট ও চিত্রশিল্পী সমীরণের (ঋষভ) সঙ্গে। কাকার অ্যান্টিক রত্ন ও ছবি সংগ্রহের শখ। অথচ সেসব যেন হঠাৎ ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে।

এইসবের মাঝে জড়িয়ে পড়তে হয় একেনকে এবং তারপর থানার আইসি আব্দুল কাদিরের (সাগ্নিক) সঙ্গে হাত মিলিয়ে বেলালের বিরুদ্ধে একেনের বুদ্ধির লড়াই চলে সমানে-সমানে। এবং সম্ভবত এই প্রথমবার এই কেসকে একেন তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ‘খ্যাঁচাম্যাচা কেস’ নামেও অভিহিত করেননি। দর্শকও করবেন না। কারণ এবারের গল্পের প্লট থেকে পরিচালনা, নির্মাণ থেকে অভিনয়, আগাগোড়া সবটাই অত্যন্ত টানটান।
একেন কাহিনির মূল প্রতিপাদ্য কমেডি এবং কথার খেলা। এক্ষেত্রে শ্যেনদৃষ্টি সম্পন্ন ‘সেন’টিকে কিঞ্চিৎ প্রশ্রয় দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ তাঁর আপাত আলাভোলা রূপটি বারবার দর্শকের মন জয় করতে সক্ষম। পেশাদার চিত্রকরের সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাস সিক্সে সবুজ মাঠ আর গাওয়া ঘিয়ের ছবি আঁকার গল্প করতে একমাত্র একেনবাবুই পারেন। বীরেশ্বরের রত্ন সংগ্রহ থেকে বেলালের সন্ত্রাসবাদী হামলার ছক তৈরির কাহিনি সাবলীলভাবে এগিয়েছে। তার মধ্যেই যেভাবে স্টেগানোগ্রাফি বা মর্স কোডের ব্যাখ্যা এসেছে তা বুদ্ধিদীপ্ত। এই সময়গুলোয় আলাদাভাবে একেনকে চেনা যায়।
আরও পড়ুন: বড়পর্দা থেকে নাটকের মঞ্চে ‘সপ্তপদী’
পুরোনো বারাণসী শহরের নিজস্ব একটা ঝলমলে, রঙিন রূপ আছে। ফলে বেনারস ঘাট সংলগ্ন এলাকায় শুটিং করলে সেই পাঁচমিশালি আবহ ছবিতে আপনিই ঢুকে পড়ে। প্রায় প্রতিটি ফ্রেমে রয়েছে রঙের বিস্ফোরণ। তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে কিংবদন্তি মাসান হোলির দৃশ্য, সম্ভবত বাংলা ছবিতে প্রথমবার। ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে এরকম এক বিশেষ উদযাপনের ব্যবহার আর তার সঙ্গে আবহে বেজে চলা শিব তাণ্ডব স্তোত্র, জয়দীপের উইনিং স্ট্রোক বলা যায়। আর বেনারসে গোয়েন্দা গল্প অথচ সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধা জানানো হবে না তা কি হয়? কীভাবে, সেটা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখাই ভালো।
অভিনয়ে প্রত্যেকেই যথাযথ। অনির্বাণকে নিয়ে সত্যিই আর নতুন কিছু বলার নেই। আনকোরা নতুন একটি চরিত্রকে যেভাবে গত কয়েক বছরের চেষ্টায় তিনি বাঙালির চোখের মণি করে তুলেছেন তার জন্য তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য। শাশ্বতকে এই ছবিতে বেশ কিছু ছদ্মবেশে দেখা গিয়েছে। বলা বাহুল্য সেই মেকআপ শিল্প এবং প্রতিটি মেকআপে স্বয়ং তিনি অনবদ্য। তবে তাঁর অভিনয়ের সুযোগের কিঞ্চিৎ অভাববোধ হলো। বেলাল আর একটু অংশ জুড়ে থাকতেই পারত।
আরও পড়ুন: ‘আবোল তাবোল’ নিয়ে রহস্য, সমাধান করবেন রাহুল ও ঋতুপর্ণা
আলাদাভাবে মনে রাখার মতো বিশ্বনাথের উপস্থিতি। কোথাও তাঁকে বাঙালি বলে বোঝা পর্যন্ত যায়নি। ইশাকে এরকম চরিত্রে আগে দেখা গিয়েছে কিনা জানা নেই। তবে তিনি দামিনী চরিত্রে বেশ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন, দেখতেও ভারী সুন্দর লেগেছে তাঁকে। গৌরব ও ঋষভ দুজনেই বেশ ভালো। দেবেশকে ইদানিংকালে বেশ কিছু ছবিতে দেখা গেলেও বড় স্বল্প পরিসরে থাকেন তিনি। বীরেশ্বর চরিত্রের প্রতি সুবিচার করেছেন দেবেশ।
বহুদিন বাদে বড়পর্দায় দেখা গেল সাগ্নিককে। অবাঙালি, কঠিন পুলিশকর্তার ভূমিকায় দিব্যি মানিয়ে গিয়েছেন তিনি। অভিনয় তিনি ভালোই করেন। আশা করা যায় বাংলা ছবিতে আবারও নিয়মিত হয়ে উঠবেন তিনি। একেনের ডান এবং বাঁহাতের ভূমিকায় সুহোত্র ও সোমক বরাবরের মতোই মানানসই ও সাবলীল।
আর পড়ুন: বিপ্লবী না ডাকাত? প্রথমবার বায়োপিকে জিৎ
টুবানের ক্যামেরায় বেনারস শহর সত্যিই দেখার মতো হয়ে উঠেছে। শুভদীপ গুহর আবহ বেশ কিছু দৃশ্যে জমিয়ে দেবে। পদ্মনাভর চিত্রনাট্য একেনের জন্য প্রায় প্রতিবারই তাক লাগিয়ে দেয়। সুযোগ বুঝে পানের (pun) ব্যবহার এই বাংলা ভাষার আকালে বড় আশা জাগায়।
একটাই দুশ্চিন্তা। একই চরিত্রের সিনেমা এবং সিরিজ়ে বারংবার আগমন দর্শকের ভালবাসাকে কতদিন ধরে রাখতে পারবে বা হঠাৎ করেই বিরক্তি এনে দেবে কিনা সেটা নিয়ে নির্মাতাদের এবার ভাবা প্রয়োজন। তবে দু’ঘণ্টার কম সময়ে বেনারস ভ্রমণ ও জমকালো রহস্যের প্লট একসঙ্গে দেখতে চাইলে সাম্প্রতিক একেন অভিযান মিস করা যাবে না, ভরপুর গরমের যথার্থ রেমিডি।
