আসছে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বড় মাপের প্রদর্শনী ‘আমারে দেব না ভুলিতে’

RBN News Desk : সারা বিশ্ব জুড়ে চলা এই চূড়ান্ত অস্থির সময়ে মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে (Kazi Nazrul Islam) স্মরণ করে আর কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এক বড় মাপের প্রদর্শনী। নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৩ মে থেকে ৩০ মে ‘আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক নজরুল-বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করছে নজরুল চর্চা কেন্দ্র ছায়ানট (কলকাতা)। যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টসের সুনয়নী চিত্রশালা ও চিত্তপ্রসাদ গ্যালারিতে আগামী ২৩ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। নজরুল সংক্রান্ত বিভিন্ন না-দেখা অজানা দুর্লভ নথিপত্র দেখা যাবে এই প্রদর্শনীতে, যা নজরুলপ্রেমীদের কাছে তো বটেই যে কোন সাহিত্যপ্রেমী বা ইতিহাস সচেতন মানুষের কাছেই তা হয়ে উঠবে আগ্রহের বিষয়।

কবি বিমল মৈত্র লিখেছিলেন,
তেরোশো ছয়ের এগারো জ্যৈষ্ঠ নেমে এলো ধরাধামে
দেব-শিশু এক বর্ধমানের চুরুলিয়া ছোট গ্রামে।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই জীবনধারণের জন্য তাঁকে করতে হয়েছে হরেক রকম কাজ। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ঠিক আগে ১৯১৭ সালে রানীগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র নজরুল ইসলাম হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে যোগ দিলেন সেনাবাহিনীতে। এ ব্যাপারে জানতেন শুধু তাঁর স্কুল জীবনের পরম বন্ধু পরবর্তী কালের অসামান্য কথা সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় । ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে, নজরুল করাচি থেকে কলকাতায় এসে প্রথমে তাঁর বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মেসে এবং পরে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’-র অফিসে ওঠেন। সেখানে দিন দুই থেকে তিনি চুরুলিয়ায় যান এবং সপ্তাহখানেক ছুটি কাটিয়ে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় ফিরে শুরু হয় নজরুলের সাহিত্যিক জীবন। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি অতিবাহিত করেছেন বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান এই কলকাতায়। নানা কারণে বার-বার ঠিকানা বদল করেছেন। কলকাতা শহরে ছড়িয়ে রয়েছে নজরুলের বহু স্মৃতি। তাই নজরুল-স্মৃতি বিজড়িত এই শহরেই ‘আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক প্রদর্শনীর আয়োজন। ২৩ মে থেকে ৩০ মে প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত্রি ৮টা পর্যন্ত নজরুলপ্রেমীরা উপভোগ করবেন নজরুল-সংক্রান্ত বিরল সামগ্রী দিয়ে সাজানো এই প্রদর্শনী। ছায়ানট (কলকাতা)-র সভাপতি সোমঋতা মল্লিকের ভাবনায় দুই বাংলার বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের সংগ্রহ দিয়ে অতি যত্নে সাজানো হচ্ছে এই প্রদর্শনী।

আরও পড়ুন: পঁচাত্তর বছরে কলকাতার চিল্ড্রেনস লিটল থিয়েটার

প্রদর্শনীতে থাকছে কলকাতার বিশিষ্ট অটোগ্রাফ সংগ্রাহক মলয় সরকারের সংগ্রহ থেকে কাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর যা এই প্রদর্শনীর বিশেষ আকর্ষণ। বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলোকচিত্রী সাহাদাত পারভেজ-এর সংগ্রহ থেকে থাকছে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রয়াত আলোকচিত্রী অলক মিত্রর তোলা ছবিও প্রদর্শনীতে দেখা যাবে। গৌতম ব্যানার্জী, স্বাগত গুপ্ত, আশিক মিঞার সংগ্রহ থেকে দেখা যাবে নজরুল-সংক্রান্ত বেশ কিছু দুর্লভ ছবি।

আরও পড়ুন: প্রকাশিত হল বিক্রম ঘোষ-এর ফিউশন ব্যান্ডের নতুন অ্যালবাম রিদমস্কেপ ২.০

বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র পরমানন্দ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে কবির স্বকণ্ঠে গান ও কবিতার গ্রামোফোন রেকর্ডও শোনানো হবে। সেই সঙ্গে ঈশিতা বসু রায়ের সংগ্রহ থেকে প্রণম্য শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুল-সঙ্গীত ও কবিতার বেশ কিছু দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড ও ক্যাসেট প্রদর্শিত হবে। কলকাতার বিশিষ্ট সংগ্রাহক শৌভিক রায়ের সংগ্রহ থেকে দেখা যাবে ভারত,বাংলাদেশ,পাকিস্তানে নজরুলের ওপর নির্মিত ডাকটিকিট। শেখর দে প্রদর্শনীতে সংযুক্ত করবেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশে নির্মিত বিশেষ মুদ্রা। বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগ্রাহক সাকিল হকের তৈরি বিশেষ দেশলাই বাক্স প্রদর্শনীতে অন্য মাত্রা যোগ করবে। নজরুলের ছবি দিয়ে তৈরি দেশলাই বাক্স সত্যিই এক অভিনব সংযোজন। ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহ থেকে থাকছে বেশ কিছু দুর্লভ সামগ্রী — নজরুলের অগ্নি-বীণা কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ, বেতার জগৎ-এ নজরুলের বিশেষ সংখ্যা, ডাকটিকিট সহ আরও অনেক কিছু। বিদ্যাপতি, সাপুড়ে, গোরা, চৌরঙ্গী সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নজরুল। ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহ থেকে সেই সমস্ত চলচ্চিত্রের বুকলেটস্ প্রদর্শনীতে থাকবে। অপ্রতিম বসুর সংগ্রহ থেকে থাকবে নজরুলের ‘চোখের চাতক’ বইয়ের প্রথম সংস্করণ সহ বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী। ওয়াসিম কাপুর, বাপ্পা ভৌমিক, সুব্রত কর, রাসেল রহমান শিমুল সহ ভারত ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীদের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতি প্রদর্শনীতে দেখা যাবে। কফি দিয়ে নজরুলের ছবি আঁকবেন কফিম্যান পার্থ মুখার্জী। শৌভিক রায়ের সংগ্রহ থেকে থাকবে বাংলাদেশে তৈরি সিরামিক প্লেটে নজরুল। মৌটুসী ঘোষের আঁকা ‘আলপনায় নজরুল’, সুবীর বিশ্বাসের তৈরি স্লেট পাথরে নজরুল সহ বিভিন্ন মাধ্যমে নজরুলকে তুলে ধরা হবে। এছাড়াও প্রতিদিন গ্যালারিতে ‘আরশি কলকাতা’ – র পক্ষ থেকে চিত্রশিল্পীরা সুমিত গুহর পরিচালনায় লাইভ পেন্টিং করবেন যা নজরুলপ্রেমীদের কাছে উপরি পাওনা। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক এমদাদুল হক নূরের সংগ্রহ থেকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উপলক্ষে দুই বাংলা থেকে প্রকাশিত ২১টি বই প্রদর্শনীতে স্থান পাবে। নজরুল গবেষক, ছায়ানট (কলকাতা) – এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিকের সংগ্রহ থেকে থাকবে বেশ কিছু পুরনো, দুষ্প্রাপ্য পত্রিকার নজরুল-সংখ্যা, গ্রামোফোন রেকর্ড, ডাকটিকিট। কাজী নজরুল ইসলাম যে বিদ্যালয়ে পড়াশুনো করেছিলেন, সেই বিদ্যালয়ের (রানীগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুল) উদ্যোগে নজরুল জন্ম-শতবর্ষে যে বিশেষ বইটি প্রকাশিত হয়, সেটি প্রদর্শিত হবে সোমঋতার সংগ্রহ থেকে। কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের পরের দিনের (৩০ আগস্ট, ১৯৭৬) যুগান্তর পত্রিকা সহ বেশ কিছু কবির খবর সংক্রান্ত পত্রিকাও দেখা যাবে। ভারতবর্ষে নজরুল-স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলি সম্পর্কে নজরুলপ্রেমীদের অবগত করার জন্য সুদীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ছায়ানট। তারও কিছু ঝলক থাকবে এই প্রদর্শনীতে। নজরুল কলকাতায় যে সব বাড়িতে থেকেছেন, ২০১৮ সালে সোমঋতা মল্লিকের তত্ত্বাবধানে মাসুদুর রহিম রুবাইয়ের ক্যামেরায় তোলা সেই বাড়িগুলির ছবিও প্রদর্শিত হবে।

আরও পড়ুন: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণে নতুন রাগ সৃষ্টি করলেন দেবজ্যোতি মিশ্র, বাঁধলেন বন্দিশ

এই উদ্যোগ সম্পর্কে ছায়ানট (কলকাতা) – র সভাপতি এবং প্রদর্শনীর কিউরেটর সোমঋতা জানালেন, “আমাদের প্রাণের কবির জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে জনগণকে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে অবগত করার উদ্দেশেই আমাদের এই ৭ দিন ব্যাপী বিশেষ আয়োজন। নজরুল সংক্রান্ত দুর্লভ সামগ্রী কীভাবে দীর্ঘদিন সযত্নে লালন করছেন সংগ্রাহকরা তা দেখে আমরা সত্যিই বিস্মিত। প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিন (২৩ মে), আমরা নজরুলপ্রেমীদের পক্ষ থেকে সংগ্রাহকদের বিশেষ সম্মান প্রদান করব। প্রতিদিন গ্যালারিতে বসবে নজরুলপ্রেমীদের আড্ডা, থাকবে নজরুল-সংক্রান্ত ক্যুইজ ও নজরুল-শব্দবাজি, গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ারে শোনা যাবে নজরুল-সঙ্গীত।” কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে এত সমৃদ্ধ উদযাপন সাম্প্রতিককালে কলকাতায় হয়নি।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *