রাজ কপূরের বাড়িতে সিমিকে দেখে পছন্দ করেন সত্যজিৎ রায়
RBN Web Desk: ১৯৬৯ সালের ঝাড়খণ্ডের ছিপাদোহারের সেই জঙ্গল সংলগ্ন ঘরে কোনও আলোর ব্যবস্থা ছিল না। না ছিল ঠিকঠাক ওয়াশরুম, ছিল না জলও। ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াত মাকড়সা ও নানা পোকামাকড়। তিনবেলায় খাওয়ার জন্য আলু ছাড়া বিশেষ কিছু জুটত না। তার মধ্যেই মানিয়ে নিয়ে বেশ কয়েকদিন ছিলেন তৎকালীন মুম্বইয়ের ‘আধুনিকা’ অভিনেত্রী সিমি গরেওয়াল (Simi Garewal)। কারণ তাঁর ভাষায়, “এই সবকিছু সহ্য করা যায় যদি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সঙ্গে কাজের সুযোগ মেলে।” উপরি পাওনা ছিল চাঁদনী রাতে পুরো টিমের সঙ্গে হেঁটে বেড়ানো, ক্যামেরার নানান অ্যাঙ্গেল নিয়ে পরীক্ষা আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। সিমির স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির শুটিংয়ের সেই সব দিন। এই ছবিতে সিমি অভিনয় করেছিলেন দুলি নামে এক আদিবাসী রমণীর চরিত্রে।
১৩ মে থেকে শুরু হয়েছে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। সেখানেই এ বছর দেখানো হবে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) পরিচালিত এই ছবির পুনরুদ্ধার করা প্রিন্ট। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির প্রিন্টকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে যাদের উদ্যোগে তাঁরা হলেন সত্যজিৎ অনুরাগী পরিচালক মার্টিন স্করসেসে (Martin Scorsese) ও ওয়েস অ্যান্ডারসন (Wes Anderson)। কানের মঞ্চে ছবিটি প্রেজেন্ট করবেন অ্যান্ডারসন নিজে। সিমি ছাড়াও ভারত থেকে এই ছবির প্রতিনিধিত্ব করবেন শর্মিলা ঠাকুর (Sharmila Tagore)। এছাড়াও থাকবেন প্রযোজক নেপাল দত্তের স্ত্রী পূর্ণিমা দত্ত। উল্লেখ্য, ৭৭ বছর বয়সে এই ছবি নিয়েই প্রথমবার কানে পা রাখবেন সিমি।
আরও পড়ুন: ‘সোনার কেল্লা’কে ট্রিবিউট দিতে চলেছেন রিঙ্গো
বিদেশি আদবকায়দায় অভ্যস্ত তাঁর মতো অতি-আধুনিকা এক অভিনেত্রীকে একটি আদিবাসী রমণীর চরিত্রে সত্যজিৎ রায় ছাড়া আর কেউ ভাবতে পারতেন বলে মনে করেন না সিমি। প্রথমবার সিমিকে তিনি দেখেন রাজ কপূরের বাড়িতে। সেদিন ছিল ‘মেরা নাম জোকার’ ছবির প্রিভিউ শো। ছবির পরে ছিল ডিনারের ব্যবস্থা। সিমি খেয়াল করেছিলেন তাঁকে লক্ষ করছেন সত্যজিৎ। আরও অনেকেই সেদিন ব্যাপারটা খেয়াল করেন। এর ঠিক একমাস পরে রায়ের তরফে চিঠি যায় সিমির কাছে। চিঠিতে ছবির অফারের সঙ্গে ছিল অনুরোধ। সিমিকে একবার কলকাতায় আসতে হবে স্ক্রিন টেস্টের জন্য। যদিও তার সঙ্গে এ কথাও লেখা ছিল যে এটা শুধুই একটা মেকআপ ও কস্টিউম টেস্ট, সিমির অভিনয় দক্ষতা নিয়ে পরিচালকের কোনও সন্দেহ নেই।

সমিত ভঞ্জের সঙ্গে
তবে এরপরেও অনেক বিস্ময়ের বাকি ছিল। ট্রেন আর গাড়ি করে ছিপাদোহার পৌঁছনোর পরেও প্রায় এক সপ্তাহ সিমিকে কাজ করতে দেননি সত্যজিৎ। প্রতিদিন ভাটিখানায় গিয়ে বসে থাকতে হতো আদিবাসী মহিলাদের হাবভাব লক্ষ করার জন্য। এই সেই ভাটিখানা যেখানে ছবিতে অসীম, সঞ্জয়, হরি ও শেখর যায় পানীয়ের সন্ধানে। দুলির চরিত্র ঠিক কেমন হবে এখানে আসা মহিলাদের দেখে শিখতে হয়েছিল সিমিকে। তবে নিজেকে ওই চরিত্রে সাজিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া তাঁর কাছে বেশ উপভোগ্য ছিল বলে জানিয়েছেন সিমি।
আরও পড়ুন: বিপ্লবী না ডাকাত? প্রথমবার বায়োপিকে জিৎ
প্রতিদিন চারঘণ্টা ধরে তাঁর মেকআপ চলত। সিমিকে সর্বাঙ্গে কালি মাখিয়ে কৃষ্ণাঙ্গী চেহারা দেওয়া হতো। শুটিংয়ের পর প্রায় তিনঘণ্টা লেগে যেত সেই কালি তুলতে। এই সময়ের মাঝে তিনি এক রুক্ষ মাটির অশিক্ষিত আদিবাসী কন্যায় পরিণত হতেন। এই ছবির সময়েই চিত্রনাট্য থেকে স্টোরি বোর্ড তৈরি করা শেখেন সিমি। পরে নিজের ছবির ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। পরবর্তীতে সত্যজিৎ তাঁর পেনফ্রেন্ড বা পত্রবন্ধু হয়ে ওঠেন। আজও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে সত্যজিতের নিজে হাতে লেখা অজস্র চিঠি যা তিনি সযত্নে রক্ষা করে চলেছেন।
তথ্যসূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া
