মুশকিল আসান রাখি, দোসর শিবপ্রসাদ

ছবি: আমার বস

পরিচালনা: নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

অভিনয়ে: রাখি গুলজ়ার, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, কাঞ্চন মল্লিক, সৌরসেনী মৈত্র, শ্রুতি দাস, আভেরী সিংহ রায়, ঐশ্বর্য সেন, গৌরব চট্টোপাধ্যায়, শিবপ্রসাদ 

দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট

RBN রেটিং ★★★★★★★☆☆☆

চাইলেই অফিস থেকে ছুটি পাওয়া যাবে না। অগত্যা বাড়িতে অসুস্থ মা-বাবাকে একা রেখেই কাজে যেতে হবে। কারও বাড়িতে অবশ্য বয়স্ক মানুষের দেখাশোনা করার জন্য গৃহসহায়িকা থাকে। তবে মুশকিল হলো তারা কেউই ছেলেমেয়ের জায়গা নিতে পারে না। প্রিয়জনের স্পর্শ না পাওয়ার ক্ষত থেকে বয়স্কদের নানা ধরনের রোগব্যাধি চেপে ধরে। নার্স, বা গৃহসহায়িকাদের বাহ্যিক সেবাযত্ন বা ওষুধপথ্যে সেই রোগ সারে না।



কলকাতার এক নামী প্রকাশনা সংস্থার মালিক অনিমেষ (শিবপ্রসাদ) ও তার মা শুভ্রার (রাখি) গল্পটা শুরু হয় এভাবেই। সংস্থার কাজে ব্যস্ত ছেলে মায়ের যত্নে কোনও ত্রুটি রাখে না। কিন্তু মায়ের শিশুসুলভ আবদার-আহ্লাদ বোঝার বা রাখার সময় তার হাতে নেই। তাই শুভ্রাদেবী মনস্থ করেন একদিন ছেলের সঙ্গে তার অফিসে যাবেন। ছেলের পাশে বসে থাকবেন, চাইলে সংস্থার কাজও করবেন। বাড়িতে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে আটক হয়ে শুয়ে-বসে-টিভি দেখে কাটানোর চাইতে এটি ঢের ভালো বিকল্প বলে মনে করেন তিনি।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ছেলের হাজার আপত্তি সত্ত্বেও শুভ্রাদেবী অফিসে গিয়ে হাজির হন। শুধু কী তাই! এই বয়সে আবার রীতিমতো ছেলের অফিসে ট্রেনি পদে একটি চাকরিও করতে শুরু করেন অবসরপ্রাপ্ত সেবিকা শুভ্রা। ছেলের সান্নিধ্যে থেকে শরীরের তো বটেই মনের অসুখও সেরে যায়।

আরও পড়ুন: আবারও একসঙ্গে জন-অক্ষয়?

কিন্তু এমন সুবিধা তো সকলের ভাগ্যে জোটে না। অসুস্থ মা-বাবা কিংবা সন্তানকে বাড়িতে রেখে এসেও শান্তি নেই। কাজে তার প্রভাব পড়ে। বসের ধমক, অপমান সহ্য করে দাঁতে দাঁত চেপে অনেকেই কাজ করে শুধুমাত্র পেট চালানোর তাগিদে। ছেলের অফিসে কাজ করতে গিয়ে তা টের পান শুভ্রা। প্রকশনা সংস্থায় কর্মরত সকলের সমস্যা এক-এক করে মেটানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

ওদিকে পুত্রবধূ মৌসুমির (শ্রাবন্তী) সঙ্গে অনিমেষের ব্যক্তিগত জীবনে টানাপড়েন সামাল দিতেও হাল ধরতে হয় তাঁকে। গোস্বামী প্রকাশনা সংস্থায় ট্রেনি হয়ে প্রবেশ করে কীভাবে এই বয়সে শুভ্রাদেবী সেখানকার বস হয়ে ওঠেন তার জন্য অবশ্যই ছবিটি দেখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: ক্লান্ত দাম্পত্যের কাহিনি নিয়ে ‘অসহ্য’

অভিনয় প্রসঙ্গে আসা যাক। এই ছবিতে দু’জন স্ট্রাইকার। প্রথমজন অবশ্যই রাখি। দ্বিতীয়জন শিবপ্রসাদ।  মা-ছেলের সম্পর্কের রসায়ন অনবদ্য। দু’জনের অভিনয় প্রসঙ্গে আলাদা করে বলার কিছু নেই। কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাননি, বরং একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। রাখি কখনও মা হয়ে ছেলেকে পরামর্শ দিয়েছেন, আবার কখনও বন্ধুর মতো ছেলের পাশে থেকেছেন। মেয়েদের কল্পনায় যেমন শাশুড়ি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে, শুভ্রা যেন অনেকটা তেমনই। নিন্দুকেরা হয়তো অনেকেই জোর করে প্রবীণ অভিনেত্রীর বাংলা সংলাপে জোর করে হিন্দির টান খুঁজতে যাবেন। তবে তা না করাই শ্রেয়।

পর্দার শিবপ্রসাদ একটু মাতৃভক্ত। ঘরে-বাইরে মায়ের দেখানো পথেই হাঁটতে চেষ্টা করেন। তবে ভালো ছেলেরা যে সবসময়ে ভালো স্বামী হয়ে উঠতে পারেন এমন তো নয়। মায়ের যত্নে কোনও ত্রুটি না রাখলেও সংস্থার মালিক হিসাবে কর্মচারীদের সুখ-দুঃখের খবর রাখা, তাদের অভিভাবক হয়ে ওঠার বিশেষ দক্ষতা সকলের থাকে না। চরিত্র অনুযায়ী সেই সব খামতি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিবপ্রসাদ। পরিচালক-অভিনেতা হওয়ার এই এক সুবিধে।

আরও পড়ুন: ‘আবোল তাবোল’ নিয়ে রহস্য, সমাধান করবেন রাহুল ও ঋতুপর্ণা

শিবপ্রসাদের সঙ্গে শ্রাবন্তীর প্রেম, দাম্পত্য এবং দূরত্ব আরও খানিক দীর্ঘ হলে ভালো হতো।  ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে চুম্বনের বদলে শ্রাবন্তীর উন্মুক্ত পিঠে কবিতার লাইন লেখার ভাবনা যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, তাঁর তারিফ অবশ্যই করতে হয়। তবে কাজল পেন্সিলের বদলে লিপস্টিক বা তরল সিঁদুরের লাল রং দিয়ে পিঠে কবিতা লিখলে বোধহয় ষোলোকলা পূর্ণ হতো।

প্রকাশনা সংস্থার মালিক এবং টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যনিবাহী সম্পাদকের জীবনধারায় বিস্তর ফারাক থাকা সত্ত্বেও তাঁদের প্রেম হয়। সেই প্রেম পরিণতি পায়, আবার নিয়ম অনুযায়ী তাদের সম্পর্কে দূরত্বও তৈরি হয়। এখানে নতুনত্ব কিছু নেই। তবে ছেলে-বৌমার চিড়ধরা সম্পর্কে মোমের প্রলেপ দিতে শাশুড়ি হিসাবে শুভ্রার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চেনা শাশুড়ি মায়েদের থেকে এখানে শুভ্রাকে একেবারে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন লেখক-পরিচালক নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ।

আরও পড়ুন: বিপ্লবী না ডাকাত? প্রথমবার বায়োপিকে জিৎ

ছবিতে নানা স্তর থেকে উঠে আসা বিভিন্ন বয়সি মেয়েদের যাপন এবং লড়াইয়ের গল্প আঁকা হয়েছে। সৌরসেনী, শ্রুতি, আভেরী, ঐশ্বর্য, উমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যেকেই নিজেদের চরিত্রে যথাযথ। রয়েছেন আরও অনেকে. দক্ষিণ ভারতীয় উন্নিকৃষ্ণণের চরিত্রে কাঞ্চনের অভিনয় অসাধারণ। তুলনায় গৌরবের উপস্থিতি বেশ ম্লান। বিশেষ ভূমিকায় দেখা যাবে জয় গোস্বামী, জগন্নাথ বসু, উর্মিমালা বসু, তিলোত্তমা মজুমদার, প্রচেত গুপ্তের মতো সাহিত্যজগতের নক্ষত্রদের। ছবি শেষের বিশেষ চমকটিও মনে রাখার মতো। তবে সম্পাদকের কারিকুরি ভালো হলে দ্বিতীয়ার্ধ আরও একটু টানটান হতে পারত।

বিষয়ের দিক থেকে নন্দিতা-শিবপ্রসাদ জুটি কখনওই দর্শককে নিরাশ করেনি। ‘আমার বস’ (Aamar Boss) নিয়ে তাই বিশেষ আক্ষেপ থাকবে না। অনুপম রায়ের কণ্ঠে ‘মালা-চন্দনে বেঁধো না’, সাহানা বাজপেয়ীর গাওয়া ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই’ এবং প্রস্মিতা পালের ‘আজ বসন্ত ডেকেছে আমাকে’ তিনটি গানই শ্রুতিমধুর। ছবি শেষ হলেও তার রেশ থেকে যাবে।




Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
4

Ankeeta

Sleep, travel, eat, repeat! Anchor, presenter, news reader, editor by profession. Long drives and exploring life are my favorite options. Stuck between food and fitness. Intoxicated by music. Painting, singing, photography and Rabindranath are my soulmates

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *