জটিল রহস্য নিয়ে স্মার্ট থ্রিলার
ছবি: দুর্গাপুর জংশন
পরিচালনা: অরিন্দম ভট্টাচার্য
অভিনয়ে: স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, বিক্রম চট্টোপাধ্যায়, একাবলী খান্না, রাজদীপ সরকার, প্রদীপ ধর, অসীম রায়চৌধুরী, অক্ষয় কপূর
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট
RBN রেটিং ★★★★★★☆☆☆☆
‘অন্তর্লীন’, ‘অন্তর্ধান’, ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’, অরিন্দমের প্রথমদিকের সবক’টি ছবিই জমাটি থ্রিলার। ‘শিবপুর’ ছিল গ্যাংওয়ারের ছবি। ‘দুর্গাপুর জংশন’ (Durgapur Junction) দিয়ে আবারও নিজের চেনা থ্রিলারের গণ্ডিতে ফিরলেন তিনি। যদিও ট্রেলার দেখে মনে হবে পুলিশ কোনও বড় রহস্যের সমাধান করার চেষ্টা করছে যার সঙ্গে বহু মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। গল্পের ভেতর ঢুকলে বোঝা যায় এই মাঠে পরিচালক আগেও খেলেছেন।
ছবির কাহিনি এক নিরীহ ভিটামিন ট্যাবলেট নিয়ে। দুর্গাপুর শহরে হঠাৎই ওষুধের বিষক্রিয়ায় কিছু মানুষ মারা যেতে থাকে। অসুখ গুরুতর হোক বা সামান্য, যাদের নানারকম ওষুধ খেতে হয়, তাদের মধ্যেই ঘটছে এমন ঘটনা। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে, একটি বিশেষ কোম্পানির কিছু ভিটামিন ট্যাবলেটের বোতলে সায়নাইড ভরে দেওয়া হচ্ছে। ওষুধ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হৃদরোগে মৃত্যু ঘটছে। পুলিশের উচ্চ-আধিকারিক গৌরীর (একাবলী) নির্দেশে অনুসন্ধান শুরু করে ইন্সপেক্টর সৌম্য (বিক্রম)।
অন্যদিকে সিনিয়র সাংবাদিক উষসী (স্বস্তিকা) একটা ক্রাইম স্টোরি করতে গিয়ে চাকরিজীবনে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ওই একই ভিটামিন খেয়ে মারা যায় তার স্বামীও। উষসীকে জেরা করে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। অগত্যা টেলিভিশনে জানানো হয়, এই ওষুধ খেয়ে আর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে ফোন করে জানান। সৌম্যর ফোনে যোগাযোগ করেন মিসেস ডিসুজ়া। কয়েকমাস আগে তার স্বামীও মারা গিয়েছেন হৃদরোগে।
আরও পড়ুন: আবারও একসঙ্গে জন-অক্ষয়?
রহস্য ধাপে-ধাপে এগিয়েছে, উন্মোচনও হয়েছে একটু-একটু করে। আশির দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটেলে ঘটে যাওয়া এক হত্যা রহস্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এই ছবি। ছবির প্লাস পয়েন্ট বলা যেতে পারে ক্যামেরার কাজ, আলো আঁধারি মুহূর্তের ভেতর দিয়ে রহস্যকে আরও জটিল করে তোলা। প্রসেনজিৎ চৌধুরীর চিত্রগ্রহণ এই ছবির অন্যতম সম্পদ। ছবির একাধিক দৃশ্য ইদানিংকালের স্মার্ট থ্রিলার সিরিজ়কে মনে করাবে। দ্বিতীয় অবশ্যই ছবির আবহ। অনুসন্ধানমূলক থ্রিলার ছবিতে আবহ সঙ্গীত ছবির আমেজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী এক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। এখানেও তেমনটাই ঘটেছে। একইসঙ্গে বলতে হয় রূপম ইসলামের কন্ঠে ‘সায়ানাইড’ গানটির কথাও। ছবির মেজাজের সঙ্গে দুর্দান্তভাবে মিশে যায় গানটি।

তবে দুর্বলতাও যে নেই তা নয়। ছবির মাঝামাঝি জায়গায় এসে হঠাৎ করেই টানটান দৃশ্যপট শিথিল হয়ে যায়। স্পষ্ট বুঝে ফেলা যায় গল্প এভাবে শেষ হতে পারে না। সেখান থেকেই থ্রিলারপ্রেমী দর্শক বুঝে ফেলবেন আসল অপরাধী কে হতে পারে। চিত্রনাট্যে এই ব্যাপারটার দিকে খেয়াল রাখা উচিত ছিল। এছাড়াও ছবির সব ঘটনাই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটতে থাকার ফলে অজস্র কেমিক্যালের নাম, তাদের রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে নিয়ে ওষুধের বিষক্রিয়া ইত্যাদি প্রায় ঝড়ের গতিতে দেখানো হয়। সাধারণ দর্শকের পক্ষে এত তাড়াতাড়ি এই সবকিছু বুঝে ফেলা কঠিন। পাশাপাশি সিরিয়াল কিলিংয়ের মোটিভও খুব একটা পরিষ্কার নয়।
এত কম সময়ের মধ্যে ছবিকে বেঁধে ফেলার প্রয়োজনীয়তাও পরিষ্কার হয় না। এতবড় একটা রহস্য কাহিনি আরও কিছুটা সময় দাবি করে। যেহেতু ছবির ঘটনায় অনেকগুলো পরত পরের পর আসতে থাকে তাই সবটাকে খুব দ্রুততার সঙ্গে দেখাতে হয়েছে। সম্পূর্ণ কাহিনি এতটাই জটিল যে এই নিয়ে একটি আট পর্বের সিরিজ় তৈরি হতে পারত। কারণ তাতে করে চরিত্রগুলোর বিন্যাস দেখার সুযোগ থাকত।
আরও পড়ুন: বিশিষ্ট বাঙালির চরিত্রে সইফ, শুটিং শুরু শীঘ্রই
সৌম্যর চরিত্রের শুধুমাত্র তদন্তকারী দিক সামনে আসে। কিন্তু তার একান্তে চিন্তাভাবনা করা, জলের ধারে গিয়ে নিজেকে আলাদা করে নেওয়া তাকে আর পাঁচটা অন্য পুলিশ অফিসারের থেকে পৃথক করে দেয়। তার চরিত্রের অন্য দিকগুলো সামনে এলে হয়তো ক্লাইম্যাক্স বুঝতে সুবিধা হতো। কারণ কোনওরকম আগাম প্রস্তুতি ছাড়া যে ক্লাইম্যাক্স এত কিছু সামনে আনল তার মূল দুই চরিত্রের নেপথ্য কাহিনি এবং চরিত্রের অন্যান্য দিক প্রকাশ্যে আনার প্রয়োজন ছিল। সেদিক দিয়ে বড় তাড়াতাড়ি গল্প শেষ হয়ে গেল। অরিন্দমের ছবির সঙ্গে যারা পরিচিত তারা আর একটু পরিষ্কার মোটিভ ও গুছিয়ে গল্প বলার প্রত্যাশা রাখেন। সেটা এই ছবিতে কিঞ্চিৎ অমিল। তবে ক্লাইম্যাক্স যেমন টানটান, তেমনই উত্তেজনাপূর্ণ। স্বস্তিকা এবং বিক্রম দুজনেই এই দৃশ্যে যথাযথ। শেষের টুইস্ট যদিও প্রত্যাশিত ছিল।
আরও পড়ুন: ফেলুদা সিরিজ়ে চিরঞ্জিৎ
স্বস্তিকা সুঅভিনেত্রী, কাজেই এমন একটি চরিত্রে তিনি কামাল করবেন সেটাই স্বাভাবিক। আগাগোড়া সব জায়গাতেই তাঁকে দেখতে যেমন সুন্দর লেগেছে তেমনই প্রশংসনীয় তাঁর অভিনয়। নতুন প্রজন্মের নায়কদের মধ্যে বিক্রম ক্রমশ নিজের আলাদা জায়গা করে নিচ্ছেন। এই ছবিতে তাঁকে দেখলে বোঝা যায় এ ধরনের সিরিয়াস চরিত্রে অনবদ্য তিনি। যত দিন যাচ্ছে পরিচালকদের ভরসার জায়গাও হয়ে উঠছেন বিক্রম। সিনিয়র অফিসারের ভূমিকায় একাবলী যথেষ্ট মানানসই। আগামী দিনে বড় চরিত্রে সুযোগ পাবেন তিনি, আশা করা যায়। মানিয়ে গিয়েছেন মিসেস ডিসুজ়ার ভূমিকাভিনেত্রীও। ফরেনসিক ল্যাব বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় অসীম বেশ ভালো। রাজদীপ, প্রদীপ, অক্ষয় প্রত্যেকে নিজেদের জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য।
কিছুটা ওয়েব সিরিজ়ের ধাঁচে তৈরি স্মার্ট থ্রিলার ছবি ‘দুর্গাপুর জংশন’। যতটা ঝকঝকে মেকিং তেমনই তার টেকনিক্যাল দিক এবং অভিনয়ও। চিত্রনাট্যের দিক থেকে আরও একটু পরিষ্কার হতে পারত গল্পটি। সঙ্গে আর একটু পরিসর পেলে গল্প তার যোগ্য জায়গায় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেতে পারত বলে মনে হয়। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি এবং আবহের আমেজ নিঃসন্দেহে বড়পর্দায় অনেক বেশি উপভোগ্য লাগবে।
