আব্বুলিশ, টেথোস্কোপ আর তিন খুদের স্বপ্ন

ছবি: অঙ্ক কি কঠিন

পরিচালক: সৌরভ পালোধী

অভিনয়ে: রিদ্ধিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতশ্রী চক্রবর্তী, তপোময় দেব, প্রসূন সোম, পার্নো মিত্র, উষসী চক্রবর্তী, শঙ্কর দেবনাথ, দীপান্বিতা  নাথ

দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট

RBN রেটিং ★★★★★★★★☆☆

বড় হয়ে কী হতে চাও? এমন প্রশ্ন প্রায়ই ছোটদের দিকে ধেয়ে আসে। কেউ বলে মাস্টার, কেউ বলে বাস ড্রাইভার। কেউ হতে চায় ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার। কেউ আবার মায়ের মতো নার্স হতে চায়। অনেকটা রাজারহাট-নিউটাউন সংলগ্ন এক বস্তিতে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা বাবিন, ডলি আর টায়ারের মতো।



থাকদাঁড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত এই তিন বিচ্ছু আর স্বপ্ন দেখত ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু ২০২০ সালে সেই যে পৃথিবীজুড়ে অতিমারির ঢেউ এল, তারপর থেকেই স্কুলের গেট আর ওদের ভবিষ্যৎ, দুটোতেই তালা ঝুলে গেল। ছেলেমেয়েকে বড় স্কুলে পড়ানোর ইচ্ছে থাকলেও সাধ্য ছিল না এদের পরিবারের। কারও বাবা দিনমজুর, কারও মা লোকের বাড়িতে কাজ করে। কেউ আবার অভাবের সংসার ঠেলতে ঝাঁ চকচকে বহুতল বাড়ির ঠান্ডা ঘরে থাকা বাবুদের সঙ্গে সময় কাটাতে যান যাতে কোনও মতে পেট চলে। তবু বাবা-মায়েদের এই কঠিন বাস্তব কি বাবিন, ডলি বা টায়ারদের স্বপ্ন দেখা আটকাতে পারে?  

আরও পড়ুন: আবারও একসঙ্গে জন-অক্ষয়?

চিকিৎসার অভাবে পাড়ার শ্যামলকাকুর মৃত্যু দেখে বাবিন (রিদ্ধিমান), ডলি (গীতশ্রী) এবং টায়ার (তপোব্রত) ঠিক করে পরিত্যক্ত ‘আব্বুলিশ’ বাড়ির পাঁচতলায় তারাই হাসপাতাল তৈরি করবে। বাবিন ডাক্তার আর ডলি নার্স তো ছিলই. সঙ্গে টায়ার ইঞ্জিনিয়ার থাকায় বাড়তি সুবিধাও হলো। আর এদের অবাস্তব, অলীক স্বপ্নে ধুনো দিল শাহরুখদা (প্রসূন)। শাহরুখ এক অতি সাধারণ যুবক, বাড়ি-বাড়ি খাবার পৌঁছে রোজগার করে। কিন্তু বাবিন, ডলি, টায়ারের কাছে সে-ই আলাদিনের জিন। হাসপাতাল তৈরি করতে যা-যা লাগে তার জোগান দেয় এই শাহরুখদা। তার ফোন থেকে ইউটিউব ঘেঁটে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় নানা জিনিস সম্পর্কে তাদের ধারণা হয়। পাড়া ঘুরে মরচে ধরা ছুরি-কাঁচি, ব্যবহারের অযোগ্য ‘টেথোস্কোপ’ নিজেরাই জোগাড় করে. ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে নিজে হাতে একটি ঠেলাগাড়িও বানায় টায়ার। আর কখনও-কখনও শাহরুখদার কাছে আবদার করে ডিসপোজ়েবল মাস্ক, বাল্ব কিনে দেওযার জন্য। খেলার অনুসঙ্গ ভেবে সেই সব জিনিস তিনি কিনেও আনেন। কিন্তু আস্ত একটা হাসপাতাল গড়া তো মুখের কথা নয়। সব বুঝেও ওদের এই সহজ, সরল কিন্তু অবাস্তব স্বপ্নে জল ঢালতে চান না শাহরুখ।

Onko Ki Kothin

ওই পাড়াতেই থাকে কাজল (পার্নো)। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবিকা। ভালোবাসে শাহরুখকে। স্বপ্ন দেখে ঘর বাঁধার। কিন্তু বিধর্মী ছেলেকে পছন্দ করার অপরাধে নিজের বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়। তবু স্বপ্ন দেখতে ভোলে না। শাহরুখের মতো কাজলও বাবিন, ডলি, টায়ারদের ভালোবাসে। এদের সকলের স্বপ্ন বাস্তবে সত্যি হয় কি?

অভিনয়ের কথায় আসা যাক। ডাক্তার, নার্স এবং ইঞ্জিনিয়ারের ভূমিকায় রিদ্ধিমান, গীতশ্রী এবং তপোময়, এই তিন বিচ্ছুই আসলে ‘অঙ্ক কি কঠিন’ (Onko Ki Kothin) ছবির হোতা। এই তিনজনের দেখা স্বপ্ন নিয়েই ছবির গল্প বুনেছেন সৌরভ ও সৌমিত দেব। ছোটদের মুখে এমন সংলাপ তাঁরা বসিয়েছেন যে, শত কষ্টের মধ্যেও অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কখনও জোরে হেসে উঠবেন আবার কখনও ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখ মুছতে রুমাল খুঁজবেন।

আরও পড়ুন: কেমন আছে মুকুলের বাড়ি? ছবি তুলে আনলেন রিঙ্গো

শাহরুখের চরিত্রে প্রসূন অনবদ্য। বড়পর্দায় তেমন কাজ না করলেও, মঞ্চাভিনেতা হিসেবে প্রসূনের যথেষ্ট পরিচিতি আছে। এরপরেই বলতে হয় পার্নোর কথা। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবিকা, ভুলোমনা প্রবীণা ঠাকুমার একমাত্র নাতনি, আবার শাহরুখের প্রেমিকা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পার্নো অসামান্য। সে তুলনায় উষসীর অভিনয় বেশ ফিকে মনে হলো। বাবিনের বাবার চরিত্রে শঙ্কর এবং মায়ের চরিত্রে সঞ্জিতার অভিনয় যথাযথ। টায়ারের মায়ের চরিত্রে দীপান্বিতার কথা বলতেই হয়। এ ছাড়া প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, ওষুধের দোকানের মালিক, কনস্টেবলের চরিত্র নির্বাচন একেবারে খাপে খাপ। বিশেষ ভূমিকায় দেখা যাবে নাট্যব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায়কে।

আরও পড়ুন: ভবতারিণীর আশীর্বাদ নিতে শহরে কাজল

‘অঙ্ক কি কঠিন’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক দেবদীপ মুখোপাধ্যায়। ছড়া বলার মতো করে মনের কথাগুলো সহজেই সুরে বেঁধে ফেলেছেন তিনি। তিন খুদের কণ্ঠে ‘চাপ নিয়ে লাভ নেই’ গান সময়োপযোগী। শুনতে মন্দ লাগে না। এ ছাড়া নচিকেতা চক্রবর্তী, লগ্নজিতা চক্রবর্তীও এই ছবিতে গান গেয়েছেন। তবে আবহের দিকে একটু আরেকটু নজর দিলে ভাল হতো।

ছোটদের ছবির ক্ষেত্রে আতস কাচ হাতে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ না করাই ভালো। মনে দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে যাবে শাহরুখদা, কাজলদি, বাবিন, ডলি আর টায়ার। বিষয় নির্বাচন, পরিচালনার কাজেও দক্ষতার ছাপ রেখেছেন সৌরভ। এই ছবিতে সমাজের এমন একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে যা ঝাঁ চকচকে বহুতলের আলোয় চাপা পড়ে থাকে। যদিও পরিচালকের মত, কোনও ছবিই সমাজকে আমূল বদলে দিতে পারে না, সমাজ বদলাতে পারেন নেতা-মন্ত্রীরা, আর পারে ভোটবাক্স। তবু ছোটরা তো সেসব বোঝে না। একবুক স্বপ্ন নিয়ে তাদের কারবার। আর ছোটদের স্বপ্ন থেকে বড়দের বাস্তবগুলো বিয়োগ করলে হাতে কিছুটা আশা তো পড়ে থাকে। তাই না হয় থাক। ‘হাতে কিছু একটা থাকা তো ভালো না কি?’




Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
1

Ankeeta

Sleep, travel, eat, repeat! Anchor, presenter, news reader, editor by profession. Long drives and exploring life are my favorite options. Stuck between food and fitness. Intoxicated by music. Painting, singing, photography and Rabindranath are my soulmates

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *