টাটকা, বুদ্ধিদীপ্ত, টানটান: ছবির তিন খুঁটি
সিনেমা: রবীন্দ্র কাব্য রহস্য
পরিচালনা: সায়ন্তন ঘোষাল
অভিনয়ে: ঋত্বিক চক্রবর্তী, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সুজন মুখোপাধ্যায়, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, রাজনন্দিনী পাল, সুরজয় ভৌমিক
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট
RBN রেটিং ★★★★★★☆☆☆☆
অরণ্যদেব: নচিকেতা চক্রবর্তী বলে গিয়েছিলেন, ‘মশলামুড়ির মতো মশলাছবির যুগে কে আর ঝুঁকির পথে যায়?’ তাই, হিট সিনেমার ফিট ফর্মূলা এখন থ্রিলারই। তারই মধ্যে দাঁড়িয়ে একঘেয়ে খুনখারাপির রহস্যভেদের পথে হাঁটলেন না সায়ন্তন ঘোষাল। তাঁর নতুন ছবি ‘রবীন্দ্র কাব্য রহস্য’র (Rabindra Kabya Rahasya) সাফল্যের ফর্মূলায় অন্যতম উপাদান খুন নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৯২১ সালে লন্ডনের বুকে খুন হয়েছিলেন তিন বাঙালি। এ ছাড়া, এক রবীন্দ্রভক্ত কর্মচারী একলব্য সেন (ঋতব্রত) আত্মহত্যা করেছিলেন। তার পরে কেটে গিয়েছে ১০০ বছর। রবীন্দ্র অনুরাগী অধ্যাপক-সাহিত্যিক অভীক বসুর (ঋত্বিক) কাছে হঠাৎই এসে পৌঁছয় একলব্য সেনের লেখা একটি চিঠি। তাতে তাঁর দাবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কিছু অপ্রকাশিত কবিতা তিনি লুকিয়ে রেখেছেন লন্ডনের বুকে। সেই চিঠিতে দেওয়া ধাঁধার সমাধান করলেই মিলবে সে কবিতাগুলি। লন্ডনে পৌঁছে অভীক শরণাপন্ন হন আরও এক রবীন্দ্র-গবেষক বুধাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের (সুজন)। আলাপ হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিয়া সেনের (শ্রাবন্তী) সঙ্গেও। পাশাপাশি, সারা বিশ্ব জুড়ে চলতে থাকা এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ, এ কথাও জানতে পারেন অভীক। তিনি কি পারবেন, সেই অপ্রকাশিত কবিতাগুলি খুঁজে বের করে আনতে এবং এই ষড়যন্ত্র ভেঙে দিতে?
আরও পড়ুন: প্রাচীন মন্দিরের খোঁজে শতাক্ষী, হদিশ দেবে ‘কাল্পনিক’
ছবির নায়ক হিসেবে ঋত্বিক তাঁর চিরাচরিত ঢঙে সাবলীল। শ্রাবন্তী আগের তুলনায় অনেক পরিণত। সুজনকে এই ধরনের চরিত্রে দর্শক বহুবার দেখেছেন। তাই, তাঁর কিছু ম্যানারিজ়মই দর্শকদের কাছে ছবির স্পয়লার হয়ে দাঁড়ায়। বিদীপ্তার বিশেষ কিছু করার জায়গা ছিল না। বরং, স্বল্প পরিসরে অবাক করেছেন প্রিয়াংশু। মেকআপের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সাজটুকুর কথা বাদ দিয়ে দিলেও তাঁর প্রায় পুরো ছবি জুড়ে দৃষ্টি দিয়ে অভিনয় প্রশংসনীয়। ঋতব্রত একশো বছর আগের ম্যানারিজ়ম ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাতে বেশ সফল। তেমনটাই সফল শান্তিলাল ও রাজনন্দিনী।
সৌগত বসুর কাহিনি ও চিত্রনাট্য অনুযায়ী এই ছবির প্রায় গোটাটাই লন্ডনে আবর্তিত হয়েছে। সায়ন্তনের পরিচালনায় এই ছবির মূল প্রশংসার জায়গা ছবির ঘটনাক্রমের বাঁধুনি। প্রতিটি সূত্রকে প্রথমার্ধে যেভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তার সবকটিকেই দ্বিতীয়ার্ধে যথাযথ যুক্তি দিয়ে আবারও গুটিয়ে আনা হয়েছে। ইতিহাসনির্ভর সিনেমার ক্ষেত্রে অনেক সময়েই চরিত্রের কথায় অতিরিক্ত ইতিহাস চলে এসে ‘ইনফোডাম্পিং’ হয়ে যায়। সে দিক থেকে দেখলে এ ছবি মেদবর্জিত। চিত্রনাট্যকার খুব বেশি রাখঢাক করে কাহিনি বলতে চাননি। ফলে, একটু সতর্কভাবে ছবিটি দেখলে প্রথমার্ধের পরেই গোটা রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে হ্যাঁ, ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’ ছবিতে যে সায়ন্তন-সৌগত জুটিকে দর্শক পেয়েছেন, সেই জুটির থেকে আরও অনেক বেশি প্রত্যাশা থেকেই যায়।
আরও পড়ুন: ₹৫০ কোটি ছুঁল ‘সিতারে জ়মিন পর’, বাজিমাত আমিরের
ছবির দ্বিতীয় প্রাপ্তি অবশ্যই তার গান। দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীত পরিচালনায় এই ছবির আবহ ও গান অন্য মাত্রা পেয়েছে। গান বলতে শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহারও বুদ্ধিদীপ্ত।
ছবিতে টুবানের চিত্রগ্রহণে নতুনত্বের ছোঁয়া মেলে না। অতীতকাল বোঝাতে শুধুই সাদা-কালো টোন ব্যবহার না-করে আরও ক্যামেরার কারসাজি করা যেতে পারত। সম্পাদনায় মনে রাখার মতো কিছু নেই। তবে, এত বড় বাজেটের ছবিতে প্রাচীন বইয়ের নামের ফন্টে হাল আমলের ছোঁয়া খুবই দৃষ্টিকটু লাগে। বড়পর্দায় গোটা স্ক্রিন জুড়ে তা কয়েক সেকেন্ডের জন্য এলেও প্রশ্ন রয়ে যায়, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ডিজ়াইনারদের কি এতই দৈন্য দশা? এছাড়াও রবি ঠাকুরের নোবেল চুরি যাওয়া এক রহস্যময় ব্যাপার বটে। কিন্তু বিংশ শতকের শুরু হোক বা হাল আমল― নোবেলের রেপ্লিকা কি বাজারে এতই সহজে মেলে!
তবে মোটের উপর, বিনোদনের মাপকাঠিতে দিব্য উতরে যায় ‘রবীন্দ্র কাব্য রহস্য’, তাই গরমের এক বিকেলে প্রেক্ষাগৃহে এ ছবি দেখতে গেলে সময়টা মন্দ কাটবে না।
