জটিল জটে আচ্ছন্ন ‘ম্যাডাম সেনগুপ্ত’
ছবি: ম্যাডাম সেনগুপ্ত
পরিচালনা: সায়ন্তন ঘোষাল
অভিনয়ে: ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কৌশিক সেন, রাহুল বসু, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত দত্ত, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়, সুদীপ মুখোপাধ্যায়, রৌনক দে ভৌমিক, খরাজ মুখোপাধ্যায়, পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, রতন সরখেল
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট
RBN রেটিং ★★★★★★☆☆☆☆
সুকুমার রায় ‘আবোল তাবোল’ (Abol Tabol) বইয়ের ছড়াগুলি লিখেছিলেন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, নিছক ননসেন্স লিখবেন বলে নয়। এই ব্যাপারটা পাঠকদের সকলে না জানলেও অনেকেই জানেন। সে বই বাঙালির কাছে প্রায় ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার মতোই। তা সেই নিয়েই যখন আদ্যোপান্ত একটা রহস্য বোনা হচ্ছে তখন আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। সেরকমই আগ্রহ ছিল ‘ম্যাডাম সেনগুপ্ত’ (Madam Sengupta) তথা আবোল তাবোল রহস্য নিয়ে। আগ্রহের ফলাফল কী দাঁড়াল দেখে নেওয়া যাক।
অনুরেখা সেনগুপ্ত (ঋতুপর্ণা) নামকরা কার্টুনিস্ট, তিনি ম্যাডাম সেনগুপ্ত নামেই পরিচিত। তিনি দিল্লিতে থাকলেও তার একমাত্র মেয়ে অনন্যা কলকাতার বঙ্গীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসে এবং সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এক রাতে সে খুন হয় অচেনা আততায়ীর হাতে। অনুরেখা কলকাতায় আসে মেয়ের দেহ শনাক্ত করতে। অনন্যার খুনিকে খুঁজে বার করার কাজে অনুরেখার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় পুরোনো বন্ধু রঞ্জন (রাহুল) ও তার লেখিকা স্ত্রী যশোধরা (অনন্যা)। অনন্যার কলেজের অনেকেই এই খুনের ব্যাপারে আচমকা নিখোঁজ নাট্যকার প্রফেসর সাত্যকি সেনকে (কৌশিক) সন্দেহ করে। যদিও বিশেষ একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা নীল (রৌনক) কিছুতেই মানতে পারে না সাত্যকি এর মধ্যে জড়িত। অনুরেখা নিজেও বিশ্বাস করে না সে কথা। এরই মধ্যে পরপর খুন হয়ে যান কলেজের উচ্চপদস্থ আধিকারিক বিলাস মজুমদার (সুদীপ) ও পুলিশের ইনভেস্টিং অফিসার হরেন মণ্ডল (সুব্রত)। প্রত্যেকটা খুনের রাত্রে আততায়ী ‘আবোল তাবোল’ বইয়ের বিশেষ কিছু চরিত্রের আদলে তৈরি করা পুতুল রেখে যায় রঞ্জনের সংবাদপত্র অফিসের সামনে। ক্রমশ অনুরেখা ও রঞ্জনের সামনে অপরাধের প্যাটার্ন ধরা পড়তে থাকে।
আরও পড়ুন: ভারতীয় সহনশীলতাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ‘পরিক্রমা’
প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার রহস্যের প্লট সাজানো হয়েছে অত্যন্ত জটিল ধাঁচে। সৌগত বসুর কাহিনিতে বিষয়ের অভিনবত্ব রয়েছে নিঃসন্দেহে। তবে সেই নিয়ে রহস্যের অবতারণা করার সময় এতটাই জটিলতা তৈরি করা হয়েছে যা সাধারণ দর্শকের পক্ষে বোধগম্য নাও হতে পারে। অনেকগুলো চরিত্রের আনাগোনায় গল্প বেশ ভালোই এগোতে থাকে। কিন্তু রহস্যের জট খোলার কাজ শুরু হতেই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে যায় অত্যন্ত জটিল এক জালে জড়ানো হয়েছে গোটা গল্পকে যা অনুধাবন করতে দর্শককে বেগ পেতে হবে।
বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে ছবিতে। যেমন রঞ্জনের নিজের সংবাদপত্র অফিস ‘সমান্তরাল’, যেখানে কখনওই কাউকে কাজ করতে দেখা যায় না। গোটা ছবিতে কোথাও মিডিয়া হিসেবেও সমান্তরাল-এর নাম উঠে এল না। খুনের পর পুতুলগুলো কেন সেখানেই পাঠানো হচ্ছে এটাই তো সবচেয়ে বড় ক্লু হতে পারত। কিন্তু সে কথা পুলিশকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করে না রঞ্জন। অবশ্য পুলিশকে এখানে কার্যত নিষ্কর্মা করেই রাখা হয়েছে। তদন্ত মূলত ম্যাডাম সেনগুপ্তই করেছেন আগাগোড়া। পুলিশ বরং তাদের গতিবিধি ম্যাডামকে জানিয়েছে। এমনকী ক্রাইম সিনে পরে পৌঁছে ম্যাডাম ও রঞ্জন যে অকাট্য প্রমাণ খুঁজে পান সে জিনিস পুলিশের চোখ এড়িয়ে যায় অদ্ভুতভাবে। তাছাড়া একজন চিত্রকর কতটা বিখ্যাত হলে সমাজের প্রায় সর্বস্তরে তার পরিচিতি থাকে সেটাও অবাক করে।
তবে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে ‘আবোল তাবোল’-এর চরিত্রদের নায়ক অথবা খলনায়ক বানিয়ে যে সমাধানসূত্র বেরিয়ে এল তাও যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে যে খুন করা হয় সেখানে পেশাদার অপরাধীকে কাজে লাগানোই দস্তুর। এত বড় কাজ এভাবে আনাড়ির হাতে ছাড়া হয় না কখনওই। আর এত করেও ম্যাডামের মেয়ের খুনের মোটিভ মেলে না। কারণ সে এমন কিছু শক্তিশালী নেত্রী হয়ে উঠেছিল বলে মনে হয় না। বরং পরবর্তী খুনগুলো করার অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল। তাছাড়াও এই বাজারে একটা নাটকের চরিত্র পাওয়ার জন্য এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার বিষয়টাও অদ্ভুত লাগে।
আরও পড়ুন: সৌরভের বায়োপিকে ডোনার ভূমিকায় কি মিমি?
বেশ কিছু অসঙ্গতি সত্বেও যে কারণে গোটা ছবিটা দেখতে ভালো লাগে তা হলো বিষয় বৈচিত্র্য এবং সুঅভিনয়। অজস্র চরিত্রের মাঝেও আলাদাভাবে যাদের কথা মনে থেকে যাবে তার মধ্যে অন্যতম ম্যাডাম সেনগুপ্ত নিজে। ঋতুপর্ণার অভিনয় যথেষ্ট সংযমী ও মানানসই। নাট্যকার ও প্রফেসর সাত্যকির ভূমিকায় কৌশিক নিজের চরিত্রেই অভিনয় করলেন যেন। ছোট চরিত্র হলেও অনন্যার অভিনয় শক্তিশালী। তবে রাহুলের মধ্যে সাবলীলতার অভাব চোখে পড়ার মতো। সুব্রত যথেষ্ট পরিণত অভিনেতা, তবু হরেনের চরিত্রে কিঞ্চিৎ অতি অভিনয় চোখে লাগে। সুযোগ পেলে দেবপ্রিয় ছক্কা হাঁকাতে মুখিয়ে থাকেন বরাবরই। আবারও একইরকম মুন্সিয়ানা দেখালেন তিনি। খুব ছোট পরিসরে খরাজ মুখোপাধ্যায় অসামান্য। একটি বিশেষ চরিত্রে পরান বন্দ্যোপাধ্যায় যথাযথ। রৌনকের অভিনয় বেশ ভালো। সুদীপ বরাবরের মতোই ধারালো। বর্ষীয়ান অভিনেতা রতন সরখেল বেশ ভালো।
টুবানের চিত্রগ্রহণ রহস্যের পরিবেশ নির্মাণে সহায়ক হয়েছে। অনুপম রায়ের সুরে শিল্পা রাওয়ের কন্ঠে ‘যেতে দাও’ গানটি ছবির ভেতরে তো বটেই আলাদাভাবেও শুনতে ভালো লাগে।
‘ম্যাডাম সেনগুপ্ত’ ছবিটিকে এক অন্য ধারার থ্রিলার বলা যায়। যারা জটিল রহস্যের জট খুলতে ভালবাসেন তাদের ভালো লাগবে ছবিটি।
