দুর্বোধ্য সম্পর্কের রসায়ন, অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব ধরা পড়ে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য়
ছবি: পুতুলনাচের ইতিকথা
পরিচালনা: সুমন মুখোপাধ্যায়
অভিনয়ে: আবীর চট্টোপাধ্যায়, জয়া আহসান, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, শান্তিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, ভদ্রা বসু, সুরাঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিট
RBN রেটিং ★★★★★★★☆☆☆
কুসুম, শশী, সেনদিদি, কুমুদ, মোতি। এদের সঙ্গে হয়তো অনেকেরই আলাপ আছে। সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট উপন্যাসটি মূলত এদের যাপন ঘিরেই আবর্তিত। গল্পের বিষয়বস্তুও অনেকের জানা। ১৯৩৫ সালে লেখা হয়েছিল এই উপন্যাস, প্রায় ৯০ বছর পর পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় (Suman Mukhopadhyay) তাঁর চোখ দিয়ে এঁকে রাখলেন কালজয়ী সৃষ্টি ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’কে (Putulnacher Itikatha)। শশী-কুসুমের রসায়ন, মোতি-কুমুদের প্রেম, যাদব পণ্ডিতের অন্ধকার জগতের বিচরণ এবং অন্ধবিশ্বাস, সেনদিদি এবং শশীর বাবার সম্পর্কের জটিলতার গল্প ফুটিয়ে তুললেন বড়পর্দায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেমন হল সেই ছবি? পুরনো বইয়ের পাতা থেকে বড়পর্দায় উঠে আসা চরিত্রদের নির্মাণ কি আদৌ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখার মতো? তাহলে প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অবদমিত কামনা বাসনার যে দুর্বোধ্য মনস্তত্ত্বের আধারে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বর্ণিত, সুমনের এই ছবি তার সরলীকরণ মাত্র।
আরও পড়ুন: নির্জনতার প্রেক্ষাপটে বিদায়বেলার সুর
সাধারণত সাহিত্যনির্ভর ছবিতে পরিচালকের স্বাধীনতা খানিক খর্ব হয়। তবে বইয়ের পাতা থেকে চরিত্রদের তুলে এনে তাদের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার মধ্যেও তো সার্থকতা থাকে। পরিচালক সে অর্থে সফল, তবে বইয়ের পাতার সঙ্গে ছবির দৃশ্য মেলাতে গেলে সাহিত্য অনুরাগীরা মনক্ষুণ্ণ হবেন। গল্পের বিষয়বস্তু এবং সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ছবির গতিতেও লাগাম রাখতে হয়েছে। তাই এ ছবি দেখার প্রথম শর্ত হল ধৈর্য। এই সময়ে দাঁড়িয়ে পর্দায় এমন একটি গ্রামের দৃশ্য দেখানো হয় যা এখনও উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যায়নি। শশীর মতো পাশ করা ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এক গ্রাম, যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যু ঘিরে রীতিমতো উৎসব পালিত হয়। নিয়তির কাছে বিজ্ঞানকে হেরে যেতে দেখে শশীর মায়া হয়। তবু গ্রাম ছেড়ে যেতে পারে না সে।
শশীর চরিত্রে আবীর অতুলনীয়। একদিকে কুসুম, অন্যদিকে মোতি, দুই নারীর হাতছানি থাকা সত্ত্বেও ‘যদি’র চক্রবূহ্যে আটকে পড়া এক নিঃসঙ্গ সম্রাটের চরিত্র বোধহয় আবীরের পক্ষেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। অন্যদিকে শরীরসর্বস্ব কুসুমের আটপৌরে রূপে অনবদ্য জয়া আহসান। ননদ-বৌদির খুনসুটির দৃশ্যেও তিনি মনকাড়া। আবার, অবহেলিত কুসুমকে বিসর্জন দিয়ে এক অন্য কুসুম হয়ে ওঠার দৃশ্যায়ন সেটিও দর্শকের মনে গেঁথে যাবে। মোতির চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুরাঙ্গনা। প্রাণোচ্ছল, কিশোরী মোতির কল্পজগতে শশী, কুমুদের বিচরণ। মোতির মনে ডাক্তার বিশেষ জায়গা দখল করে বসে থাকলেও শেষ বাজি মাত করে যায় অন্য কেউ। ব্যর্থ প্রেমিক নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে মোতির বিদায় দৃশ্য। কুমুদের চরিত্রে পরমব্রত যথাযথ। তবে এ গল্পের নায়ক যেহেতু শশী, তাই এখানে কুমুদের ভূমিকা খানিকটা ম্লান।
পার্শ্বচরিত্র হলেও এই ছবিতে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখেন অনন্যা। বসন্তরোগে মৃতপ্রায়, একটি চোখ নষ্ট সেনদিদির চরিত্রে অনন্যার অভিনয় কোথাও যেন সকলকে ছাপিয়ে যায়। পাশাপাশি শশীর বাবার চরিত্রে শান্তিলালও কম যান না। যাদব পণ্ডিতের ভূমিকায় ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো।
আরও পড়ুন: সিনেমা নয়, বাস্তব মাতৃত্বের হরেক রূপ ফুটিয়ে তুলবে ‘ডিয়ার মা’
অভিনেতাদের পাশাপাশি এই ছবির সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজনের কথা না বললেই নয়। যেমন সঙ্গীত পরিচালক প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর তৈরি আবহে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাস যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তার সঙ্গে সায়ক ভট্টাচার্যের চিত্রগ্রহণ অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যপ্রেমীদের চোখে এই ছবি হয়তো নতুন করে কোনও উন্মাদনা সৃষ্টি করবে না, কিন্তু উপন্যাসটি না পড়ে যদি এই ছবি দেখতে আসেন সে ক্ষেত্রে দর্শক একেবারে নিরাশ হবেন না এ কথা হলফ করে বলা যায়।
