নির্জনতার প্রেক্ষাপটে বিদায়বেলার সুর
ছবি: গুডবাই মাউন্টেন
পরিচালনা: ইন্দ্রাশিস আচার্য
অভিনয়ে: ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, অনন্যা সেনগুপ্ত
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট
RBN রেটিং ★★★★★★★☆☆☆
একজন একলা মানুষ। একটা একলা জায়গা। যেখানে প্রতিদিন অনেক মানুষের আনাগোনা নেই। আছে দৈনন্দিনতার নিশ্চুপ রোজনামচা। একটা একলা ঝরনা, একলা নদী, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকদূরে চলে যাওয়া একটা একলা রাস্তা, অনেকটা দূরে একলা দাঁড়িয়ে থাকা কিছু পাহাড়। এই নিয়েই প্রতিদিনের জীবন। শুনতে রোমান্টিক হলেও সত্যিই কি তেমনটা ছিল অর্জুনের জীবন? তার ওপর সেখানে যদি কাটাতে হয় একটা নির্বান্ধব অসুস্থ জীবন। তাই অর্জুন মনেপ্রাণে চেয়েছিল আনন্দীকে। অন্তত কয়েকটা দিন আনন্দী এসে তার কাছে থাকবে, দুজনের ভোর থেকে দুপুর হয়ে সন্ধে নামবে একসঙ্গে। একে অপরকে কোনও প্রশ্ন করবে না, কোনও কৈফিয়ত চাইবে না। শুধু ভাগ করে নেবে স্মৃতি, ভাগ করে নেবে নির্ভরতা।
ইন্দ্রাশিসের সম্ভবত সবথেকে সোচ্চার ছবি ‘গুডবাই মাউন্টেন’ (Goodbye Mountain)। তাঁর ছবিতে বরাবরই সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে অন্তর্মুখী নির্জনতা। প্রায় ২২ বছর ধরে কারও জন্য অপেক্ষায় থাকা যায়? তেমন করে ভালোবাসলে বোধহয় যায়। অর্জুন (ইন্দ্রনীল) থেকে গিয়েছিল। আক্ষরিকভাবেই একলা, যেখানে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে প্রায় কোনও যোগসূত্রই নেই তেমন এক ভূখণ্ডে। কিন্তু ২২ বছর পর যেদিন আনন্দী (ঋতুপর্ণা) এল ২২টা দিন অর্জুনের সঙ্গে কাটাতে সেদিন কোথাও ফুটে উঠল না অনভ্যস্ত ওঠাবসা, চলাফেরা। বরং মনে হলো এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। এমনটাই তো স্বাভাবিক। এই নিশ্চিত নির্ভরতা, একে অপরের সঙ্গে অভ্যস্ত যাপন বারবার মনে করাবে এদের দু’জনের তো একসঙ্গেই থাকার কথা ছিল। তবু থাকা যায়নি কেন সেটা ছবিতে স্পষ্ট হয় না। ভুল বোঝাবুঝি অনেক সময়েই জীবন বদলে দেয়। এই অবাধ মিশে যাওয়ার মধ্যেই অর্জুনের অসুস্থতা এবং তারপর আনন্দীকে নিতে তার স্বামী রথীজিতের (অনির্বাণ) আগমন গল্পের নির্বিঘ্নে ভেসে চলাকে কিছুটা ধাক্কা দেয়।
আরও পড়ুন: “সব ছবির মধ্যে দিয়েই প্রচলিত বাউন্ডারিগুলো পেরোতে চাই”
রথীজিৎ এই গল্পে একটা ব্রেকিং পয়েন্ট বলা চলে। এতকালের না বলা কথা, বলতে চাওয়া অভিযোগ অভিমানের পাহাড়, বুঝেও এগোতে না পারা সংকোচ সবমিলিয়ে যে উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি তৈরি করছিল, রথীজিতের আসার সঙ্গে সঙ্গেই সবটা ভেঙে চুরমার হয়ে আবার একটা সহজ দূরত্বের দেওয়াল তুলে দেয়। একইসঙ্গে এই জায়গায় গল্পে সামান্য হলেও সত্যজিৎ রায়ের ‘কাপুরুষ’ গল্পের ছায়া দেখা যায় যেন। যদিও বিমলের করুণাকে নিয়ে কোনও নিরাপত্তাহীনতা ছিল না সঙ্গত কারণেই। রথীজিৎ অজানা আশঙ্কায় হাতড়ে মরে, বুঝতে পারলেও ধরতে পারে না। অগত্যা কামনার আড়ালে চরিতার্থ করে ক্ষোভ। কিন্তু তারপরে তার ভেঙে পড়া দর্শকের মন ছুঁয়ে যাবে। ভীষণরকম বাস্তব এক চরিত্র রথীজিৎ, যার প্রতারিত হবার সম্ভবত কোনও কারণ ছিল না। তবু কিছু মানুষ দোষ না করেও শাস্তি পায় সারাজীবন। ছেলের প্রেম করার কথা যেমন সে না জেনেও বুঝতে পারে তেমনই স্ত্রীর অবস্থানও সে বুঝতে সক্ষম।
ছবির প্রথমার্ধ গল্পের গতির কারণে বেশ শ্লথ। দ্বিতীয়ার্ধ বরং অনেক বেশি মনোগ্রাহী এবং চিন্তার খোরাক যোগায়। শুধুমাত্র দুই প্রাক্তন আর একজন ডাক্তারকে (অনন্যা) দিয়ে গল্প টেনে নিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে ট্রেকার দলটিকে অর্জুনের হোমস্টেতে এনে ফেলা হলেও তা গল্পে নতুন কিছু যোগ করে না। রথীজিতের আগমন গল্পে নতুন প্রাণসঞ্চার করে।
ইন্দ্রাশিসের ছবিতে এক অন্য ধরনের ছবির ভাষা লক্ষ করা যায়, যা হয়তো বহুল ব্যবহৃত নয়, কিন্তু বেশ একটা রেশ রেখে যায়। কেরলের ওয়েনাড়ের সৌন্দর্য নিরুচ্চারেই অনেকটা ভাষা যোগ করে ছবির ন্যারেটিভে। সঙ্গে ঋতুপর্ণা ও ইন্দ্রনীলের অভিনয়ের তালমেল সুন্দরভাবে খাপ খেয়ে যায়। ইন্দ্রনীল ইদানিং যে ধরনের চরিত্র করেন তার থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসে তৈরি হয়েছে একলা প্রেমিক অর্জুনের চরিত্র। কাব্যিক আবহে বেশ স্বচ্ছন্দ লেগেছে তাঁকে। সুন্দর লেগেছে ঋতুপর্ণাকেও। তাঁর ব্যক্তিত্ব, সাজপোশাক থেকে হাঁটাচলা বেশ একটা মায়া রেখে যায়। ছোট চরিত্রে অনন্যা বেশ মানানসই। আর চমকে দেওয়ার মতো অভিনয় অনির্বাণের। তিনি নিয়মিত অভিনেতা নন। অথচ তিনিই যেন গোটা গল্পের ভেতর ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন অসম্ভব মুনশিয়ানায়।
আরও পড়ুন: সিনেমা নয়, বাস্তব মাতৃত্বের হরেক রূপ ফুটিয়ে তুলবে ‘ডিয়ার মা’
রণজয় ভট্টাচার্যের সুরে, তমোঘ্ন চট্টোপাধ্যায়ের কথায় পৃথা চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘তুমি প্রশ্ন হয়েছ তাই উত্তর সাজি’ গানটি অনেকদিন মনে থেকে যাবে। শান্তনু দে’র চিত্রগ্রহণ চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো। আবার কখনও দেখা হওয়ার আশা থেকে আর দেখা না হওয়ার বিশ্বাসের মাঝে কোথাও যেন ভেতরে ভেতরে একাকী করে দিয়ে যায় ‘গুডবাই মাউন্টেন’।
