মশলা, অ্যাকশন, সংলাপে পারফেক্ট কমার্শিয়াল ককটেল

সিনেমা: মৃগয়া: দ্য হান্ট

পরিচালনা: অভিরূপ ঘোষ

অভিনয়ে: বিক্রম চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তী, অনির্বাণ চক্রবর্তী, রিজওয়ান রব্বানি শেখ, প্রিয়াঙ্কা সরকার, সৌরভ দাস, অনন্যা ভট্টাচার্য, যুধাজিৎ সরকার, তৃষাণজিৎ চৌধুরী

দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৫ মিনিট

RBN রেটিং ★★★★★★★★☆☆

অরণ্যদেব: বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কান পাতলে শোনা যায়, আজকাল ‘পাবলিক’ নাকি ফ্যামিলি-ড্রামা বা মেলোড্রামা ‘খাচ্ছে’ বেশি। তাই, সাম্প্রতিককালের বাংলা সিনেমার তালিকা ঘাঁটলে তথাকথিত কমার্শিয়াল ছবি খুব বেশি পাওয়া যায় না। এই বাজারেই পরিচালক অভিরূপ ঘোষ তাঁর নতুন ছবি ‘মৃগয়া: দ্য হান্ট’ (Mrigaya: The Hunt) দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, আজও কমার্শিয়াল ছবি পাবলিক ‘খায়’।




বিডন স্ট্রিট থানায় এসআই পদে যোগ দিয়েছে অনিমেষ (বিক্রম)। থানার ওসি দেবাঞ্জন (ঋত্বিক) মজার মানুষ। কাজেরও বটে। বিডন স্ট্রিট থানার অন্যতম রোঁদের এলাকা সোনাগাছি। সেখানকার যৌনকর্মীদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক দেবাঞ্জনের। সে কথা দিয়ে কার্যোদ্ধার পছন্দ করে। অন্য দিকে অনিমেষ কপিবুক পুলিশ। অবজ়ার্ভেশনই তার কাছে শেষ কথা। এই পরিস্থিতিতেই আচমকা খুন হয়ে যায় সেখানকার এক যৌনকর্মী ছায়া (প্রিয়াঙ্কা)। তার তদন্তে নামে বিডন স্ট্রিট থানা। ঘটনাচক্রে জানা যায়, এ কাজ কারও একার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। বরং এক দলের, যার নেতা সর্দার (সৌরভ)। তাকে ধরতেই মাঠে নামে দেবাঞ্জনের দল। সঙ্গী হয় সাইবার এক্সপার্ট রুদ্র (অনির্বাণ) ও কোভার্ট অপারেশন স্পেশালিস্ট ইমরান (রিজওয়ান)। তার পরের কথা বলবে বড়পর্দা।

আরও পড়ুন: টাটকা, বুদ্ধিদীপ্ত, টানটান: ছবির তিন খুঁটি

অনেক দিন পরে অভিনেতা হিসেবে নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন বিক্রম। কমার্শিয়াল, মশলা ছবিতে দর্শক যে ধরনের ‘সিংঘম’ মার্কা পুলিশ অফিসার দেখতে অভ্যস্ত, তাতে একেবারে খাপে খাপ বসেছেন তিনি। ঋত্বিককে যে চিরাচরিত চরিত্রগুলিতে দেখতে দর্শক অভ্যস্ত, তার তুলনায় অনেকটাই আলাদা ভঙ্গিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। অনির্বাণ চরিত্রাভিনেতা। সেই হিসেবে ঈশ্বরভক্ত সাইবার ক্রাইম স্পেশ্যালিস্ট রুদ্রর ভূমিকায় তিনি তুখোড়। ইমরানের ভূমিকায় রিজওয়ানও দুর্দান্ত। কিন্তু সব মিলিয়ে বাঙালির বিখ্যাত ‘রেলা’ এই চার পুলিশের চরিত্রেই জোরদারভাবে উপস্থিত। বিরক্তি, রাগের উদ্রেক করা খলনায়কের ভূমিকায় সৌরভ অপ্রতিরোধ্য। পাশাপাশি, সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় প্রিয়াঙ্কা ও যুধাজিৎও যথাযথ। নবাগতা হিসেবে অনন্যাকে পর্দায় ভালো লাগে। ছোট্ট তৃষাণজিৎ বেশ ঝকঝকে।  

Mrigaya: The Hunt

এই ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি সমান সুরে বাঁধা পড়েছে ছবির কাহিনি, সংলাপ, আবহ, চিত্রগ্রহণ ও সর্বোপরি, অ্যাকশন। দেবাশিস দত্ত ও পল্লব মালাকারের কাহিনি অবলম্বনে টানটান চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন অভিরূপ, সঙ্গে অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌমিত দেব। একটি কমার্শিয়াল ছবির জন্য যে ধরনের সংলাপ প্রয়োজন, তা সৌমিত ভালোই বোঝেন, সে ব্যাপারটা এই ছবি দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায়।

ছবির ভিজ্যুয়ালকে দর্শকদের জন্য নিখুঁত করে তুলতে চিত্রগ্রাহক শুভদীপ নস্করকে যে কতখানি পায়ের ঘাম মাটিতে ফেলতে হয়েছে, তা স্পষ্ট। সুমিতের সম্পাদনাও যথাযথ। তবে, এই ছবির অন্যতম প্রাণ অ্যাকশন। অনেক দিন পরে বাংলা ছবিতে এমন জমজমাট অ্যাকশন উপহার দেওয়ার জন্য জন্য ফাইট মাস্টার সোমনাথ বিশ্বাসকে ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন: ভাষা বিতর্ক, স্বস্তিতে কমল হাসান

পাশাপাশি, অম্লান এ চক্রবর্তী ও বব এসএনের তৈরি আবহ রীতিমতো গা গরম করে দেয়। রানা মজুমদার ও নিরুপম দত্তর সুরে গানগুলিও বেশ ভালো। তবে ‘শোর মাচা’ গানটি ছাড়া বাকি গানগুলি ছবিতে না-থাকলেও কোনও ক্ষতি ছিল না। যেমন গান, তেমন নাচ! সুস্মিতা চট্টোপাধ্যায়কে এই গানে দেখলে বোঝা যায় বাংলা ছবি আইটেম গানে মুম্বইকে টক্কর দেবার ক্ষমতা রাখে। চার দুর্ধর্ষ পুলিশের জন্য আলাদা আলাদা থিম মিউজ়িক থাকলে তা বেশ উপভোগ্য হতে পারত।

 

সমাজমাধ্যমে অনেক রসিকজনই বক্রোক্তি করে বলেন, বর্তমান বাংলা ছবির যা গুণমান, তাতে নাকি ‘বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ান’ আবেদনটি মানায় না। কিন্তু অভিরূপের মতো পরিচালকরা যদি আরও বেশি করে এমন কমার্শিয়াল ছবি তৈরি করেন (এবং প্রযোজকরা যদি এই ধরনের ছবিতে টাকা ঢালতে রাজি হন), সে ক্ষেত্রে এই আবেদনের আর প্রয়োজন হবে না। মানুষ এমনিই হলমুখি হবেন।

মোটের উপর, দু’ঘণ্টায় মারকাটারিভাবে যদি পয়সা উশুল বিনোদন চান, সঙ্গে হুলুস্থুলু অ্যাকশন, তা হলে অন্তত একটিবার প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখতে হবে ‘মৃগয়া: দ্য হান্ট’। কারণ এ ছবি একান্তই হলে বসে হাততালি এবং সিটি সহযোগে উপভোগ করার জন্য তৈরি হয়েছে।




Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *