একই নারী, একই ট্রাজেডি

ছবি: আপিস

পরিচালনা: অভিজিৎ গুহ ও সুদেষ্ণা রায়

অভিনয়ে: সন্দীপ্তা সেন, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, কিঞ্জল নন্দ, তথাগত চৌধুরী, সুদেষ্ণা রায়

দৈর্ঘ্য: ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট

RBN রেটিং ★★★★★☆☆☆☆☆

 

আপিস! শব্দটা বেশ সেকেলে। ছায়াছবির সাদাকালো যুগে এরকম চিত্র দেখা যেত। ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিটার কথা মনে আছে? যেখানে বাড়ির গৃহিণীরা মিলে ঠিক করছেন বর, দেওররা আপিসে যাওয়ার আগে কী খেয়ে যাবে। ঘুম থেকে উঠে সেই নিয়েই সংসারে চরম ব্যস্ততা। তারপর তো নানা কোলাহল। অন্যদিকে অফিস শব্দটা অনেকটাই স্মার্ট। কিন্তু অফিসে যাওয়ার আগে ওই ব্যস্ততাটা কোথাও যেন একই রয়ে গেছে। তবে একটা জিনিস বদলে গেছে কিছুটা। একালে, অনেক বেশি সংখ্যক মেয়েরাও সংসার সামলানোর দায়িত্ব নিতে আপিসে যান। সেক্ষেত্রে সংসার সামলানোর দায়িত্বটা কি ভাগ হয়েছে? কিছুটা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অভিজিৎ গুহ ও সুদেষ্ণা রায় পরিচালক জুটি কোমর বেঁধেছেন ‘আপিস’ (Aapish) নিয়ে।




কলকাতার এক অভিজাত এলাকায় রাহুল (কিঞ্জল) ও জয়িতা (সন্দীপ্তা) সান্যালের লাল নীল সংসার। তাদের এক ছেলে। নাম বুবলাই। স্বভাবে দুষ্টু। পড়াশোনা এখনও তেমন জোর কদমে শুরু হয়নি। রাহুল আর জয়িতা দুজনেই চাকরি করে। একসঙ্গে লোন নিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছে। আপিস সামলে জয়িতা নিজে হাতে সাজিয়েছে সংসার। জয়িতার শাশুড়ি (সুদেষ্ণা) থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে। আসলে ওই বৃদ্ধাশ্রমই তার আপিস। জয়িতাকে সকাল সকাল বেরিয়ে যেতে হয়। তখন জয়িতার সংসার সামলায় হাসিদি (সুদীপ্তা)। বুবলাইয়ের হাসিমাসি। হাসির বর মাধব রিক্সা চালায়। দুই ছেলেকে নিয়ে টালির চালের ভাড়া বাড়িতে ওদেরও লাল নীল সংসার। ওদের বড় ছেলেটা পড়াশোনায় বেশ ভাল। ছোটটা অনেকটাই ছোট। দাদার সঙ্গে সেও বই নিয়ে বেশ পড়া-পড়া খেলে। হাসির শ্বশুরবাড়ি জয়নগরে। মাধবরা তিন ভাই। মা নেই। বুড়ো বাবাকে কে দেখাশোনা করবে, সেই নিয়ে বেশ টানাটানি। তাই শ্বশুরবাড়িতে জায়গা হয়নি হাসির। তবে ভাড়া বাড়িতে বেশ সুখেই দিন কাটে তার। ওদের চিন্তা বাড়ে যখন বাড়ির মালিক জমিটা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। দু’মাসের নোটিসে ছেড়ে দিতে হবে এই বাড়ি। দুটো ছেলে নিয়ে কোথায় যাবে হাসি? সে দিন রাত এক করে ফেলে টাকা জমাতে। মাধবকে বিভিন্ন বুদ্ধি দিতে থাকে একটা স্থায়ী ঠিকানার জন্য। এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ে হাসির শ্বশুর। তাকে সেবা-শুশ্রূষা করে সারিয়ে তোলার ভার পড়ে হাসির ওপরেই। এদিকে শ্বশুরের দেখভাল করতে গিয়ে কাজের বাড়িতে ঘন-ঘন‌ ছুটি নিতে হয়, ফলাফল মাইনে কাটা।  অন্যদিকে কাজের লোক না আসায় ছুটি নিয়ে সংসার সামলাতে নাজেহাল হয়ে পড়ে জয়িতাও।

আরও পড়ুন: ধাঁধার থেকেও জটিল প্লটে যকের ধন খুঁজলেন সায়ন্তন

সত্যি কথা বলতে এই দুই চিত্র আম বাঙালির রোজনামচায় জড়িয়ে। ইঁদুর দৌড়ে সামিল হয়ে ফ্ল্যাট বাড়িতে বাসা বেঁধেছে প্রায় অনেকেই। ফলে কাজের লোক যদি সেখানে কামাই করে তাহলেই মুশকিল। বিশেষ করে সংসারে যদি এক খুদে সদস্য থাকে। কিন্তু হাসিদিদের কথা আলাদা। ওদের ঘরের বাচ্চারা যেন ছোট থেকেই বড় হয়ে ওঠে কেমন। হয়তো পরিস্থিতির চাপেই। আর জয়িতার ছেলে হয়ে ওঠে আলালের ঘরের দুলাল। কিন্তু ঘরে বাইরে এত কিছু সামলেও কি সংসার সুখের করে তুলতে পারে জয়িতা-হাসিরা? সেই প্রশ্নের খোঁজেই গড়িয়েছে আপিসের চিত্রনাট্য।

রোজকার চেনাশোনা ঘটনাগুলো ছবির আবহের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। শিল্পী শুভদীপ গুহ সেই কাজটি করেছেন সন্তর্পনে। রনজয় ভট্টাচার্যের সুরের বুনোট গোটা ছবিকে বেশ বেঁধে-বেঁধে রেখেছে।

তবে কোথাও গিয়ে মনে হবে শুধুমাত্র নারীর কথা বলবে বলেই এ ছবির আগমন। এবং কোথাও সেটা বেশ জোরপূর্বক। সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা নারীর যে বিভৎস রূপ দেখিয়েছে, সমাজ মাধ্যমে সেই সব ঘটনার বিবরণ শুনে চমকে উঠেছেন সকলেই। সেই সমাজ যখন এই ছবির মুখোমুখি হবে, ঠোঁটকাটার মত বলতেই পারে, ‘সেই একই কচকচানি’।

ছবিতে জয়িতার স্বামী রাহুলের চরিত্রটা খুব চেনা। পুরুষ চাকরি করা বউ পছন্দ করলেও, প্রয়োজনে সংসারের কাজ ভাগ করে নিতে চায় না। ব্যাপারটা পর্দায় বেশ ভাল মেলে ধরেছেন কিঞ্জল। যা দেখতে-দেখতে মনে হতে পারে, আজকাল গৃহকর্মে নিপুন পুরুষ যেন হামেশাই দেখা যায়।

আরও পড়ুন: ওয়েব সিরিজ়ে সোনার কেল্লা, জয়সলমের সত্যিই জমজমাট

নারী যতই স্বাধীন হোক, যতই রোজগেরে হোক না কেন, পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থায় ততটা সম্মান সে পায় না যতটা তার প্রাপ্য। সেই বার্তাই হয়তো মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন পরিচালক জুটি। এই কঠিন সত্য নারী মেনে নিয়েছে সেই কবেই। অস্তিত্ব প্রমাণ করতে তাকে যে লড়তে হবে, বারবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে এ কথা আজ সে জানে। তাই সে বিচলিত নয়। সে জানে তাকে আপিস যেতেই হবে। কিন্তু কি হবে হাসি আর জয়িতার ভবিষ্যৎ? সংসারের হাল ধরতে তারা কোন পথে হাঁটবে? সংসার বাঁচাতে তারা কি একা হয়ে যাবে? নাকি একে অন্যের লড়াইয়ে সামিল হবে? নাকি সংসারের চক্রব্যূহে ভেসে যাবে? জানতে হলে প্রেক্ষাগৃহে একবার যেতেই হবে। 

সুদীপ্তার অভিনয় এ ছবির বাড়তি পাওনা। সন্দীপ্তা সাবলীল‌ স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী। তবে তাঁকে দেখে আমবাঙালি বাড়ির অন্যান্য চাকরি করা বউদের একটু হিংসা হতে পারে। কারণ কাজের মাসি ডুব দিলে পরিপাটি হয়ে অফিস যাওয়ার জো থাকে না মোটে। মাধবের চরিত্রে তথাগত নজরকাড়া। সুদীপ্তার সঙ্গে চুটিয়ে পাল্লা দিয়েছেন। চিত্রনাট্য আরেকটু জোরদার হলে ছবি লা-জবাব হতেই পারত। নারী মন, পরিচালক জুটি এমনিতেই প্রাসঙ্গিক বিষয় বেছে নিয়েছেন। তবে গভীরতা মেপে উঠতে আর একটু ডুব দেওয়ার দরকার ছিল।




Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Angana

A traveler and a lover with a musical heart. An avid reader and writer. Reads anything that falls on her hands. Has an analytical mind and is highly opinionated

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *