ছায়ানট কলকাতার উদ্যোগে নজরুল ইসলামের দুষ্প্রাপ্য ছবি গোর্কি সদন আর্কাইভে
কলকাতা : সম্প্রতি কলকাতার গোর্কি সদনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভ – এর হাতে ছায়ানট (কলকাতা) – এর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ছবি তুলে দেওয়া হয়। ছবিটির বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে — রাশিয়ান ভাষায় অনূদিত নজরুল রচনা-প্রকাশ অনুষ্ঠানে সোভিয়েত প্রতিনিধিদের মাঝখানে নজরুল (১৯৬৭)। কাজী নজরুল ইসলামের সুহৃদ মুজফ্ফর আহ্মদ – এর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, “শুনেছি (চোখে দেখিনি) ‘সাম্যবাদী’ তখন রুশ ভাষায় তর্জমা করা হয়েছিল।” নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা মুজফ্ফর আহ্মদ ‘রুশ বিপ্লব,লালফৌজ ও কাজী নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেছেন নজরুলের লেখায় কীভাবে আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রভাব বিস্তার করেছিল। মুজফ্ফর আহ্মদ লিখেছেন — ‘ব্যথার দান’ পড়ে আমরা তখনও বুঝেছিলেম এবং এখনও বুঝতে পারছি যে রুশ বিপ্লব ও লাল ফৌজের প্রতি নজরুলের একটা আকর্ষণ জন্মেছিল। ফৌজ হতে ফেরার আগেই তার দুটি গল্প আমরা ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছেপেছিলেম। ১৩২৬ সালে মাঘ মাসে তো ‘ব্যথার দান’ ছেপেছিলেমই, তার আগে কার্তিক মাসে (নভেম্বর, ১৯১৯) আমরা ছেপেছিলেম তার ‘হেনা’ নামক গল্প। এই দুটি গল্পই সে ফৌজে থাকা অবস্থাতে লিখেছিল এবং লিখেছিল তার হাবিলদার হওয়ার পরে।

‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য’ প্রবন্ধে নজরুল বিশ্বের মহান সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির কথা উঠে এসেছে। গোর্কি সম্পর্কে নজরুল বলেছেন — “তারপর এল এই মহাপ্লাবনের ওপর তুফানের মতো — ভয়াবহ সাইক্লোনের মতো বেগে ম্যাক্সিম গোর্কি। চেকভের নাট্যমঞ্চ ভেঙে পড়ল, সে বিস্ময়ে বেরিয়ে এসে এই ঝড়ের বন্ধুকে অভিবাদন করলে। বেদনার ঋষি দস্তয়েভস্কি বললে : তোমার সৃষ্টির জন্যই আমার এ তপস্যা। চালাও পরশু, হানো ত্রিশূল! বৃদ্ধ ঋষি টলস্টয় কেঁপে উঠলেন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বলে উঠলেন : That man has only one God and that is Satan. কিন্তু এই তথাকথিত শয়তান অমর হয়ে গেল, ঋষির অভিশাপ তাকে স্পর্শও করতে পারলে না।
গোর্কি বললেন: দুঃখ-বেদনার জয়গান গেয়েই আমরা নিরস্ত হব না — আমরা এর প্রতিশোধ নেব। রক্তে নাইয়ে অশুচি পৃথিবীকে শুচি করব।”
আরও পড়ুন: বইয়ের পাতা থেকে বড়পর্দায় রাপ্পা রায়ের থ্রিল রাইড
নজরুল গবেষক মাহবুবুল হকের নজরুল তারিখ অভিধান থেকে জানা যায় — ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই খ্যাতনামা রুশ লেখক মক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে (১৮ জুন, ১৯৩৬) প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে কলকাতার অ্যালবার্ট হলের কমিটি রুমে যে শোক সভা হয় তার অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন নজরুল। নজরুল ছাড়াও এ সভায় উপস্থিত ছিলেন সতেন্দ্রনাথ মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বিবেকান্দ মুখোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ। এই সভা থেকেই নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে সভাপতি ও সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীকে সম্পাদক করে নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের কথা ঘোষিত হয়।
আরও পড়ুন: এসে গেছে বাঙালি বিয়ের নতুন অ্যান্থেম ‘বর এলো’
এইসব তথ্যের ভিত্তিতে সহজেই বলা যায় — রুশ বিপ্লব, রুশ সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন চেতনার কবি নজরুল। তাই ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষে ছায়ানট (কলকাতা) এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত ১৮ বছর ধরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে ছায়ানট (কলকাতা)। শুধুমাত্র কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী কিংবা প্রয়াণ দিবস স্মরণ করা নয়, সারা বছর ধরেই তাঁর সৃষ্টি নিয়ে চর্চা করাই ছায়ানটের উদ্দেশ্য। নজরুল স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নজরুলপ্রেমীদের অবগত করাও ছায়ানটের কার্যক্রমের অংশ।
