ছায়ানট-এর অভিনব নজরুল-শরৎচন্দ্র ক্যালেন্ডার

কলকাতা : গত ১৮ বছর ধরে মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টির প্রচার ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করছে ছায়ানট (কলকাতা)। তাদের বছরব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম একটি উদ্যোগ — ইংরেজি নববর্ষে নজরুল সম্পর্কিত তথ্য সম্বলিত ক্যালেন্ডার প্রকাশ।
২০২৬ খ্রিস্টাব্দে অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০তম জন্মবর্ষে ছায়ানট (কলকাতা) – এর বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য, মূল্যবান ক্যালেন্ডার ‘শরৎচন্দ্র ও নজরুল’। মূল ভাবনা ও তথ্য-সংগ্রহে সোমঋতা মল্লিক। সৃজনে তুফান চ্যাটার্জী। বিশেষ সহযোগিতায় পীতম ভট্টাচার্য। 

আরও পড়ুন: নন্দিতা-শিবপ্রসাদ জুটির নতুন ছবিতে ফিরছেন অর্জুন চক্রবর্তী

এই ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতায় আছে নানা তথ্য, সাথে শরৎচন্দ্র ও নজরুলের অসাধারণ সব ছবি। ক্যালেন্ডারের প্রথমেই প্রকাশিত হয়েছে অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘শরৎচন্দ্র’ নামাঙ্কিত কবিতাটি।
নব ঋত্বিক নবযুগের!
নমস্কার! নমস্কার!
আলোকে তোমার পেনু আভাস
নওরোজের নব ঊষার!
তুমি গো বেদনা-সুন্দরের
দরদ্-ই-দিল্, নীল মানিক,
তোমার তিক্ত কণ্ঠে গো
ধ্বনিল সাম বেদনা-ঋক্।

আরও পড়ুন: ছায়ানট কলকাতার উদ্যোগে নজরুল ইসলামের দুষ্প্রাপ্য ছবি গোর্কি সদন আর্কাইভে

উক্ত কবিতাটি ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে আশ্বিনের নওরোজে প্রকাশিত হয়। পাদটীকায় বলা হয়: “স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের দ্বিপঞ্চাশৎ বর্ষ জন্মোৎসব উপলক্ষে রচিত।” রচনার স্থান ও তারিখ: কৃষ্ণনগর, ২৯ ভাদ্র, ১৩৩৪। শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পর কবিতাটি ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে মাঘের বুলবুলে পুনর্মুদ্রিত হয়।
ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতায় উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যজগতের দুই খ্যাতনামা চিন্তক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কাজী নজরুল ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা, দুজনের একাধিকবার সাক্ষাতের ঘটনা। জীবদ্দশায় একাধিকবার তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। তাঁদের মধ্যে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল, তা সত্যিই শিক্ষণীয়।
কাজী নজরুল ইসলামের একক সম্পাদনায় ২৬ শ্রাবণ, ১৩২৯ বঙ্গাব্দে (১১ আগস্ট, ১৯২২) সপ্তাহে দুবার প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শিবপুর থেকে ৯ আগস্ট, ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশ উপলক্ষে নজরুলকে দেওয়া এক শুভেচ্ছা পত্রে লেখেন: “তোমার কাগজের দীর্ঘজীবন কামনা করিয়া তোমাকে একটিমাত্র আশীর্বাদ করি, যেন শত্রু-মিত্র নির্ব্বিশেষে নির্ভয়ে সত্য কথা বলিতে পার। তারপরে ভগবান তোমার কাগজের ভার আপনি বহন করিবেন।” ১৭ই মে, ১৯২৩ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রীমতী লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায়কে চিঠিতে লেখেন — “হুগলী জেলে আমাদের কবি কাজী নজরুল উপোস করিয়া মর-মর হইয়াছে। বেলা ১টার গাড়ীতে যাইতেছি, দেখি যদি দেখা করিতে দেয় ও দিলে আমার অনুরোধে যদি সে আবার খাইতে রাজী হয়। না হইলে আর কোন আশা দেখিনা। একজন সত্যকার কবি। রবিবাবু ছাড়া বোধহয় এখন কেহ আর এত বড় কবি নাই।…” এভাবেই অনুজ কবিকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। নজরুলও তাঁর অগ্রজর প্রতি ছিলেন যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৭ সালে শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে অল ইন্ডিয়া রেডিও তাঁকে সংবর্ধনা প্রদানের বিশাল আয়োজন করে। এ উপলক্ষে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘শরৎ-শর্বরী’ অনুষ্ঠানে শরৎচন্দ্রের উপস্থিতিতে নজরুল স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। শরৎচন্দ্রের জীবদ্দশায় এটিই ছিল তাঁর শেষ জন্মোৎসব। শরৎচন্দ্রের প্রয়াণে বাংলা সহ ভারতবর্ষের বহু জায়গায় অনুষ্ঠিত শোকসভায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। বহু গুণী মানুষ তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কবিতা লেখেন। কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন —
সেদিন দেখেছি আকাশের শোভা
শরৎ-চন্দ্র তিলকে।
শূন্য গগন বিষাদ মগন
সে তিলক মুছি দিল কে।।

ক্যালেন্ডার সম্পর্কে ছায়ানট (কলকাতা) – এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিক বলেন, “বেশ কিছু বছর ধরেই আমরা ইংরেজি নববর্ষে ক্যালেন্ডার প্রকাশ করি। প্রতি বছর নজরুল সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ক্যালেন্ডার তৈরি হয়। এই বছর ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতায় আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলা সাহিত্যজগতের দুই স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কাজী নজরুল ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্ককে।
আমাদের এই প্রয়াস সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালির কাছে মনোগ্রাহী হলেই আমাদের পরিশ্রম সার্থকতা লাভ করবে।”

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *