পঁচাত্তর বছরে কলকাতার চিল্ড্রেনস লিটল থিয়েটার
RBN News Desk: আগামী ৮ মে থেকে কলকাতায় শুরু হতে চলেছে কলকাতার ‘চিল্ড্রেনস লিটল থিয়েটার’-এর (Children’s Little Theatre) (CLT) প্লাটিনাম জয়ন্তী বর্ষের উদযাপন। কলকাতার ঢাকুরিয়া অঞ্চলে সংস্থার নিজস্ব ভবন ‘অবন মহল’-এ সারা বছর ধরে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব পালন করা হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
১৯৫২ সালে এই সংস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও এই ভাবনার সূচনা হয়েছিল আরো তিন বছর আগে। ১৯৪৯-এ কলকাতার চেতলা হাই স্কুলে দক্ষিণ কলকাতা জেলা স্কাউটসের এক সমাবেশে স্কাউটার সমর চ্যাটার্জীর লেখা কয়েকটি ছড়া ছোটরা এমন চিত্তাকর্ষকভাবে পরিবেশন করে যে অনুষ্ঠানের সভাপতি ডঃ কালিদাস নাগ শ্রী চ্যাটার্জীর ভূয়সী প্রশংসা করে ভারতে শিশু থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করার উৎসাহ দেন। সেই ভাবনা থেকে ১৯৫১ সালে সমরবাবু ‘রিদম্স অ্যান্ড রাইমস’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। মেলে ভারতবর্ষের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর (Pandit Jawaharlal Nehru) পূর্ণাঙ্গ সমর্থন ও আন্তরিক শুভেচ্ছাও। শ্রী এন. এন. ভোসের উৎসাহে এবং দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে, ১৯৫২ সালের ১১ই মে নিউ এম্পায়ার মঞ্চে প্রথম সর্বজনীন প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সমর্থন জানিয়ে এগিয়ে আসে অনেক নামকরা বিদ্যালয়। প্রদর্শনীর আগে, সেন্ট জন’স ডায়োসেশন স্কুলে অনুষ্ঠিত একটি মহড়ায় উপস্থিত ছিলেন সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) । তিনি তখন পুরোদস্তুর একজন শিল্পী, তাই তিনি যা দেখছিলেন সেই মজাদার কার্যকলাপ মাথায় রেখে চট করে একটি খসড়া স্কেচে এঁকে ফেলেন ঢাল-তরোয়াল হাতে একটি শিশুর ছবি। যা পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের প্রতীক। ১৯৫২ সালের ৭ই জুলাই, সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘চিল্ড্রেনস লিটল থিয়েটার’, অর্থাৎ সিএলটি বা ‘শিশু রঙ্গমহল’ রাখা হয় এবং ১৯৫২ সালের ১৬ই অক্টোবর এটি যথাযথভাবে নিবন্ধিত হয়।

শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি ছড়া, সঙ্গীত, নৃত্য, অঙ্কন, টেবিল টেনিস এবং শিশুদের আগ্রহের অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় যুক্ত করার জন্য, সিএলটি বিভিন্ন স্কুল, বিশেষ করে নার্সারি ও জুনিয়র বিভাগ এবং অন্যান্য শিশু সংগঠনের সাথে তাদের কার্যক্রম যুক্ত করে। পরে স্বনামধন্য শিল্পী ও সাহিত্যিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Abanindranath Tagore) নামে সিএলটি তাদের বহু লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ক্যাম্পাস -এর নামকরণ করে ‘অবন মহল’। সিএলটি শুধু ছোটদের নাচ বা নাটক শেখার স্কুল নয় — এটি ভারত এবং পাশ্চাত্যে শিশুদের নাট্য প্রদর্শনীর অন্যতম অগ্রদূত। এটি শিশুর মধ্যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা, আত্মসংযম, মানসিক সতর্কতা এবং ব্যক্তিত্বের মতো গুণাবলী বিকশিত করে।

CLT র উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে যেমন রয়েছে ‘রামায়ণ’ (Ramayan), ‘আন্ডার দ্য সি’ (Under the Sea), ‘সাত ভাই চম্পা’র মত লোককথা ও উপকথা পাশাপাশি মঞ্চস্থ হয়েছে ‘মিথুয়া’ এবং ‘অবন পটুয়া’-র মতো মৌলিক নৃত্যনাট্যও। শুধু পণ্ডিত নেহরু (Pandit Jawaharlal Nehru), ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi), ড.বিধানচন্দ্র রায় (Dr, Bidhan CHandra Roy) বা মোরারজি দেশাই-র (Morarji Desai) মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরাই নন, CLT-এর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে এগিয়ে এসেছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর (Pandit Ravishankar) ও তিমির বরণের (Timir Baran) মতো প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীরাও। শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল বালকৃষ্ণ মেনন, কলাবতী দেবীর মতো প্রথম সারির শিক্ষকমণ্ডলীর কাছে। ১৯৬৪ সালে CLT ‘চিলড্রেনস কমনওয়েলথ প্রোগ্রাম’-এ অংশগ্রহণ করে এবং ইউরোপের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রেক্ষাগৃহে তাদের পরিবেশনা উপস্থাপন করে; যার সমস্ত আয়োজন স্বয়ং পণ্ডিত নেহরু করেছিলেন।
প্রখ্যাত অভিনেত্রী এবং CLT-র প্রথম ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্রী শর্মিলা ঠাকুর (Sharmila Tagore) বলেছেন, “আমার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই যে, শৈশবের এই অভিজ্ঞতা এবং নাট্য জগতের বহুমুখী সংস্পর্শই সৃজনশীল জগতের প্রতি আমার অনুরাগ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে এবং আমার নির্বাচিত পেশার জন্য আমাকে প্রস্তুত করে তুলেছে।”
আরও পড়ুন: প্রকাশিত হল বিক্রম ঘোষ-এর ফিউশন ব্যান্ডের নতুন অ্যালবাম রিদমস্কেপ ২.০
এই বছর, ৮ই মে CLT-র ৭৫তম প্রতিষ্ঠা দিবস । সেজন্য সারা বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘প্লাটিনাম জয়ন্তী’ বর্ষ উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ১৯ শে সেপ্টেম্বর ‘প্রতিষ্ঠাতা দিবস’ (Founder’s Day) এবং আগামী ১৮ থেকে ২১শে ডিসেম্বর ‘ডিসেম্বর উৎসব’ বা বার্ষিক অনুষ্ঠান উদযাপন করা হবে। পরিকল্পনা রয়েছে CLT-র বেশ কিছু কালজয়ী প্রযোজনাকে পুনরায় নতুনভাবে মঞ্চস্থ করার।
আরও পড়ুন: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণে নতুন রাগ সৃষ্টি করলেন দেবজ্যোতি মিশ্র, বাঁধলেন বন্দিশ
আগামী ৮ই মে সন্ধ্যেবেলা সি এল টি-র ৭৫তম প্রতিষ্ঠা দিবসের সূচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যসভার প্রাক্তন সদস্য জহর সরকার, প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব সৌমিত্র বসু, সমাজ সংস্কারক ও নৃত্যশিল্পী অলোকানন্দা রায় এবং অভিনেতা ও বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। সেই সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় থাকবে সমবেত উদ্বোধনী সঙ্গীত, কড়ির ছন্দে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের নৃত্য পরিবেশনা, রোলার স্কেটিং, আবৃত্তি, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্প অবলম্বনে নাটক ‘জোলা আর সাত ভূত’। শেষে থাকবে সংস্থার অপেক্ষাকৃত বড় শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত রবীন্দ্রনাথের গানের একটি সংকলন ‘আনন্দ’। প্রিয়লাল চৌধুরীর শ্রুতিমধুর আবহ সঙ্গীতের সুতোয় গাঁথা ‘আনন্দ’ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ১৯৬১ সালে।
চিল্ড্রেনস লিটল থিয়েটার ( CLT )-এর পঁচাত্তর বছর উদযাপনের সূচনা অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শংকর মুখার্জি সবাইকে এই আনন্দযজ্ঞে আহ্বান করে জানিয়েছেন, “শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর এই আন্দোলনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা আগামীদিনেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ “।
