কলকাতা বইমেলায় ‘নানা রঙে নজরুল’

গত ২৭ জানুয়ারি ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় মহাশ্বেতা দেবী হলে ছায়ানট (কলকাতা) – র বিশেষ অনুষ্ঠান ‘নানা রঙে নজরুল’ অনুষ্ঠিত হয়। নজরুল চর্চার ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ছায়ানটের শিল্পীরা ‘বিদ্রোহী’ কবির সৃষ্টি নজরুলপ্রেমীদের সামনে তুলে ধরেন। এক ঘন্টার এই কবিতার অনুষ্ঠানে বহুমাত্রিক নজরুল নানা রূপে নজরুলপ্রেমীদের কাছে ধরা দিলেন।
অংশগ্রহণকারী বাচিক শিল্পীদের পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। শিল্পীর পরিবেশনার আগে নির্বাচিত কবিতা সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন ছায়ানটের সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। অনুষ্ঠান শুরু হয় ইন্দ্রাণী নাগের কণ্ঠে নজরুলের ‘বাসন্তী’ কবিতা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের বেশ কয়েকটি কবিতা উচ্চারিত হয় এই সন্ধ্যায়। সুকন্যা রায়ের কণ্ঠে ‘সাম্যবাদী’, অমৃতা দাসের কণ্ঠে ‘নারী’, শর্মিষ্ঠা রায়ের কণ্ঠে ‘বারাঙ্গনা’ অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা যোগ করে। শতবর্ষ পেরিয়ে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক, তা সহজেই উপলব্ধি করেন দর্শক। অতসী সরকারের কণ্ঠে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবিতা ‘কবির মৃত্যু নেই’ এবং নরেন্দ্র দেবের লেখা ‘জাগো,জাগো নজরুল’ বিশেষভাবে বর্তমান সময়কে প্রতিফলিত করে। নজরুল-চর্চার প্রয়োজনীয়তার কথাই উঠে আসে কবিতার মাধ্যমে। শিশু শিল্পী সিন্ধুজা গাঙ্গুলী এবং শতভিষা দাসের সাবলীল উচ্চারণ অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নজরুলের প্রতি ভালোবাসার বীজ এভাবেই বপন করার কাজে নিয়োজিত ছায়ানট। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘আগমনী’র নির্বাচিত অংশ আবৃত্তি করেন তনুশ্রী অধিকারী। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সত্তার পাশাপাশি তাঁর ‘প্রেমিক’ সত্তার পরিচয় পান শ্রোতারা। মৃন্ময়ী দে মুখার্জীর কণ্ঠে ‘বিজয়িনী’, রীতি গাঙ্গুলীর কণ্ঠে ‘কবি-রাণী’, অর্পিতা জানা সাহুর কণ্ঠে ‘রাজভিখারী’ ও ‘পলাতকা’, রাজ্যশ্রী দাসের কণ্ঠে ‘কাল বৈশাখী’, ববিতা গাঙ্গুলীর কণ্ঠে ‘গানের আড়াল’, মাধবী দের কণ্ঠে ‘পথহারা’ পরিবেশিত হয়। বাচিক শিল্পীদের বৈচিত্রপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানকে অনন্যতা দান করে।
ড. বৈশাখী দাসের কণ্ঠে শোনা যায় নজরুলের স্বল্পশ্রুত কবিতা ‘দে গোরুর গা ধুইয়ে’। স্বাতী ভট্টাচার্যের নির্বাচনে ছিল দুটি কবিতা ‘অকেজোর গান’ ও ‘পিছুডাক’। নজরুলের দ্বিতীয় পুত্র বুলবুলের জন্মশতবর্ষে, বুলবুলের জন্মস্থান কৃষ্ণনগর থেকে লেখা নজরুলের দুটি চিঠি পাঠ করেন সায়ন্তনী বসু। শতবর্ষ আগে প্রণম্য বাঙালিদের প্রজ্ঞাকে সঙ্গী করে সমাজের কৃষক ও শ্রমিকদলের কল্যাণার্থে, চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘লাঙল’ পত্রিকা তৎকালীন সমাজে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ‘লাঙল’ পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা ‘সর্বহারা’ পরিবেশিত হয় অমৃতা দাসের কণ্ঠে। ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের অতি জনপ্রিয় কবিতা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ পাঠ করেন সৃজিতা ঘোষ।
অনুষ্ঠান শেষ হয় বিশেষ যৌথ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ আবৃত্তি করেন ইন্দ্রানী নাগ, সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন দেবপ্রিয়া রায়। সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ছায়ানটের এই অনুষ্ঠান নজরুলপ্রেমীদের তো বটেই, উপস্থিত সব ধরণের দর্শকদেরই মনের মণিকোঠায় বিশেষ জায়গা করে নেয়।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *