প্রয়াত ‘কলকাতার রেখা’ মিঠু মুখোপাধ্যায়, ৭১-এ থামল ‘মৌচাক’ অভিনেত্রীর জীবন
RBN News Desk : ‘বেশ করেছি, প্রেম করেছি, করবই তো… রাধার মতো মরতে হল, মরবই তো’—এই আবেগ, এই দুঃসাহসী প্রেমের প্রকাশ তাঁর অভিনয়ে পেয়েছিল অন্য মাত্রা। বাংলা ছবির সেই পরিচিত মুখ, একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা মিঠু মুখোপাধ্যায় আর নেই। ৭১ বছর বয়সে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই চলছিল তাঁর।
সত্তর ও আশির দশকের বাংলা ছবিতে সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয়ের নিজস্ব মিশেলে দর্শকের নজর কেড়েছিলেন মিঠু। তাঁকে অনেক সময় ‘কলকাতার রেখা’ বলেও উল্লেখ করা হত। ১৯৭২ সালে চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের শুরু। প্রথম ছবিতেই সমিত ভঞ্জের সঙ্গে জুটি বাঁধেন তিনি। খুব বেশি সময়ের মধ্যে বাংলা ছবির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এই অভিনেত্রী।
তবে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ছবি নিঃসন্দেহে ‘মৌচাক’। রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ‘মর্জিনা আবদুল্লা’, ‘নিশিকন্যা’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’, ‘ভাগ্যচক্র’, ‘সন্ধি’—একাধিক ছবিতে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। তাঁর অভিনয়ের পরিসর বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও বিস্তৃত হয়েছিল। ‘খান দোস্ত’, ‘সেফড জুঠ’, ‘দিল্লাগি’, ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’-র মতো হিন্দি ছবিতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে।
অভিনয়ের পাশাপাশি মিঠুর পর্দার উপস্থিতির মধ্যেও ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। তাঁর সময়ের বহু জনপ্রিয় নায়িকার মতো তিনি শুধু সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত হননি, চরিত্রের আবেগ ও ব্যক্তিত্বকেও নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। উত্তম কুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাদের সঙ্গেও পর্দা ভাগ করেছেন তিনি। তবে চলচ্চিত্রজীবন খুব দীর্ঘ হয়নি। ১৯৯০ সালে চন্দ্র বরোট পরিচালিত ‘আশ্রিতা’ ছবিতে শেষবার অভিনয় করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে নিজেকে চলচ্চিত্রজগত থেকে সরিয়ে নেন।
আরও পড়ুন: জন্মশতবর্ষে উত্তম কুমারের বিশেষ ডাক কভার প্রকাশিত
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনের শেষ কয়েক দশক ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা সত্ত্বেও একটা সময়ের পর তিনি নিজেকে ক্যামেরা এবং প্রচারের আলো থেকে সরিয়ে নেন। পরবর্তী জীবনে মুম্বইতেই থাকতেন তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সহকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ব্যক্তিগত জীবনকে বরাবরই প্রচারের বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন এই অভিনেত্রী।
দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার কারণেই তাঁর অসুস্থতার খবরও খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি। জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। শেষপর্যন্ত মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাঁর সেই লড়াই থেমে গেল।
আরও পড়ুন: গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মশতবর্ষে ভারতীয় জাদুঘরে ‘দীক্ষা মঞ্জরি’-র শ্রদ্ধাঞ্জলি
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলা চলচ্চিত্রমহলে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিনের সহকর্মী রঞ্জিত মল্লিকও এই মৃত্যুতে শোকাহত। তাঁর সঙ্গে একাধিক ছবিতে অভিনয় করা রঞ্জিত মল্লিকের কাছে মিঠুর চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত স্মৃতিরও অবসান। অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ও মিঠুর প্রয়াণে স্মৃতিচারণ করেছেন।
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রজীবন সংখ্যার বিচারে হয়তো দীর্ঘ নয়। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্র এবং পর্দার ব্যক্তিত্ব তাঁকে বাংলা ছবির ইতিহাসে আলাদা জায়গা দিয়েছে। ‘মৌচাক’-এর সেই জনপ্রিয় মুখ থেকে ‘মর্জিনা আবদুল্লা’-র অভিনেত্রী—বিভিন্ন চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
একসময় যে অভিনেত্রীকে ঘিরে ছিল রুপোলি পর্দার আলো, জীবনের শেষ অধ্যায় তিনি কাটিয়েছেন সেই আলো থেকে অনেক দূরে। কিন্তু শিল্পীর ক্ষেত্রে পর্দা থেকে সরে যাওয়া মানেই স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া নয়। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর অভিনীত ছবি, তাঁর চরিত্র, তাঁর সৌন্দর্য এবং সেই সময়ের বাংলা সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁর উপস্থিতি তাঁকে বাঙালির চলচ্চিত্রস্মৃতিতে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।
মুম্বইয়ের হাসপাতালে থেমে গেল মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনযাত্রা। কিন্তু ‘কলকাতার রেখা’ নামে যে নায়িকাকে একসময় দর্শক চিনেছিলেন, রুপোলি পর্দায় তাঁর সেই অধ্যায় শেষ হওয়ার নয়।
