“সব ছবির মধ্যে দিয়েই প্রচলিত বাউন্ডারিগুলো পেরোতে চাই”
‘নীহারিকা’ মুক্তির দু’বছর পর এই সপ্তাহে আসছে ‘গুডবাই মাউন্টেন’ (Goodbye Mountain), অভিনয়ে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। পাঁচটার ওপর বাংলা ছবি পরিচালনা করেও ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে হতাশ তিনি। চারপাশে বন্ধু আছে, তবু কাজ হচ্ছে না। তাঁর ছবির বিষয় অন্যরকম বলেই কি? কারণ খুঁজতে রেডিওবাংলানেট প্রশ্ন রেখেছিল ইন্দ্রাশিস আচার্যর (Indrasis Acharya) কাছে। কী বললেন তিনি?
‘গুডবাই মাউন্টেন’ ছবির বিষয়টা কী? ট্রেলার দেখে মনে হচ্ছে জটিল দাম্পত্য কিংবা প্রাক্তন প্রেমের ছবি, তাই কি?
ইন্দ্রাশিস: দাম্পত্যের ছবিও হতে পারে আবার প্রেমের ছবিও হতে পারে, এখনই সেটা বলব না। এটা নিয়েই কিন্তু ছবির প্রথম ৪০ মিনিট বিষয়ের অবতারণা রয়েছে। বরং এইভাবে বলতে পারি, একটা পাহাড়ের ওপর একজন থাকেন, তার কাছে এক ভদ্রমহিলা এসেছেন। তারা পূর্ব পরিচিত। তারা দেখা করতে চেয়েছিলেন। এবার তাদের মধ্যে কী সম্পর্ক বা কেন দেখা করতে এসেছে সেটা ছবির জন্য তোলা থাক।
বেশ, তবে ছবির কাস্টিং একটু অন্যরকম। ইন্দ্রনীল-ঋতুপর্ণাকে আগেও আমরা একসঙ্গে দেখেছি। কিন্তু অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে এরকম একটা চরিত্রের জন্য কাস্ট করার কারণ কী ছিল? অনির্বাণ নিয়মিত অভিনেতাও নন
ইন্দ্রাশিস: সেটা ছবি দেখলে বোঝা যাবে কেন কাস্ট করেছি। তাছাড়া অনির্বাণের অভিনয়ের স্টাইল আমার খুব পছন্দের। খুবই শক্তিশালী অভিনেতা, তাছাড়া গতানুগতিক ধরনের অভিনয় ও করে না। ওর ওই স্টাইলটা এই ছবির জন্য ঠিকঠাক লেগেছিল আমার।
ঋতুপর্ণার সঙ্গে ‘পার্সেল‘-এর পর আবারও কাজ করলে। কোনও বিশেষ কারণ ছিল একই শিল্পীকে রিপিট করার?
ইন্দ্রাশিস: ইন্ডাস্ট্রিতে যাদের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক তাদের মধ্যে ঋতুপর্ণা একজন। সিনিয়র হিসেবে উনি সবসময় পিলারের মতো পাশে থাকেন। আমি কাজ করতে গিয়ে কোনওরকম সমস্যায় পড়লে ওঁর কাছে হেল্প পেয়েছি। গল্পটা যখন আমি শুনিয়েছিলাম, উনি নিজেই করতে চেয়েছিলেন এই চরিত্রটা। আর এই চরিত্রে উনি ভীষণ ভালো মানিয়েও গিয়েছেন।
আরও পড়ুন: রূপসার ছবিতে হারানো কলকাতার গল্প
তোমার সব ছবিতেই একটা অন্তর্দ্বন্দ্বের গল্প থাকে। আবার সেটা থেকে বেরিয়ে আসার গল্পটাও থাকে। ‘বিলু রাক্ষস‘, ‘পিউপা‘ বা ‘নীহারিকা‘ সব জায়গাতেই এই ভেতরের লড়াইটা আছে। এটা কি কোথাও গিয়ে তোমার নিজেরও লড়াই বা নিজের জীবন থেকে উঠে এসেছে?
ইন্দ্রাশিস: আমি যে কোনও ছবির গল্প লেখার সময়ই এমন কিছু ক্রাইসিসের কথা লিখি যেটার মধ্যে দিয়ে আমি নিজে গিয়েছি। এবার যেহেতু সেটা আমার জানা তাই সেটা নিয়ে কাজ করতে বা বোঝাতে আমার সুবিধা হয়। প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু লড়াই থাকে। একাকিত্ব মানেই তো সবসময় একা থাকা নয়। অনেক লোকের মাঝেও একা থাকা যায়। বারবার মনে হতে থাকে এই জায়গাটা থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যেতে চাই। এই ক্রাইসিসগুলোর অভিজ্ঞতা আরও অনেকের মতো আমারও আছে। সেখান থেকেই গল্পগুলোও উঠে আসে হয়তো।

তোমার ছবি গতানুগতিকতার বাইরে অন্য কিছুর খোঁজ করে। আবার অন্য কিছু পাওয়ার গল্প বা অন্যরকম মানুষের গল্পও বলে। এই লড়াইটা যেটা নিজের সঙ্গে চলে সেটা কি ছবি পরিচালনা করতে গিয়েও ফেস করো?
ইন্দ্রাশিস: আমি নিজের জীবনকেও আসলে খুব একটা গতানুগতিকভাবে নিই না। একসময় একটা ভালো জায়গায় ম্যানেজমেন্ট পড়ার সুযোগ পেয়েও আমি আফ্রিকা চলে গিয়েছিলাম। আফ্রিকার টানেই বলা যায়। সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে নানা ঘটনার মুখোমুখি হয়ে এখানে ফিরে ঠিক করি ব্যবসা করব। তারপর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়ে সতেরো বছর কেটে যায়। চাকরি সূত্রে আমেরিকা, ইউকেতে থাকতে হয়েছে। পৃথিবীর বেশ কিছুটা অংশ ঘোরার ফলে নানা অভিজ্ঞতা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমি লক্ষ করেছি জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে কিছু বাউন্ডারি আছে। সেটা যে কোনও কাজের ক্ষেত্রেই বলছি। সেটা কিন্তু মানুষের তৈরি। যেমন বিবাহিত মানুষের গণ্ডি, চাকুরীজীবি মানুষের গণ্ডি এরকম। আমি দেখার চেষ্টা করি সমাজ প্রচলিত সেই বাউন্ডারিটা পেরোলে কী হয়। খুব সজোরে পেরোনো নয় কিন্তু, সেটা হলে তো অপরাধ হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যদি খুব স্বাভাবিকভাবে, আন্তরিকভাবে এই বাউন্ডারি পেরোয় তাহলে কী হয়? ঠিক এইগুলোই হয়েছে ‘নীহারিকা’, ‘বিলু রাক্ষস’ বা ‘পিউপা’র বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে। যেখানে এরা সেই গণ্ডিগুলো খুব স্বাভাবিকভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে। জোর করে বা অপরাধবোধ নিয়ে নয়, চাইছে বলেই পারছে। এই চাওয়াটা আমার নিজের ভেতরেও আছে। মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে আমি খুব সম্মান করি। বিশেষ করে যে ভাবনাগুলো মানুষ বলতে পারে না। ভাবনার তো কোনও সীমা থাকে না, বৈধ-অবৈধও থাকে না। সেই ভাবনার দৌড় প্রত্যেকের আলাদা। নিজের রুচি, বোধ, মূল্যবোধ এবং জাজমেন্টের পাহাড় ডিঙিয়ে মানুষ সেই বাউন্ডারিটা পেরোয়। সেটা প্রত্যেকের নিজস্ব লড়াই। সেই বাউন্ডারি ভাঙার গল্পটা আমি প্রায় সব ছবিতেই দেখাতে চেয়েছি।
বহু পরিচালক চাকরি ছেড়ে সিনেমা বানানোয় মন দেয়, তোমার ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটেছে। বাংলা ছবির বাজার যা তাতে ভবিষ্যতে আরও অনেকেই হয়তো এই রাস্তায় হাঁটবেন। তোমার নিজের ক্ষেত্রে আবার কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দেওয়া কি ক্রিয়েটিভিটির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে হয়?
ইন্দ্রাশিস: আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। আমি কিন্তু চাকরি ছেড়েই পরিচালনায় এসেছিলাম। কিন্তু অর্থনৈতিক জায়গাটা আমাদের মতো পরিচালকদের ক্ষেত্রে খুব অসুবিধার সৃষ্টি করে। পারিবারিক জীবন বা অন্যান্য জায়গায় স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও একটা স্বচ্ছলতা প্রয়োজন। এই সমস্ত নিয়ে ভাবতে গেলে ছবি করাই যাবে না। তাই নিজের ডিগনিটি বজায় রাখতেই আবার পেশায় ফিরে যাওয়া। তাছাড়া বেশ কিছু জায়গায় মানুষের উপেক্ষা, আচরণ দেখে আমার মনে হয়েছে এটা দিনের পর দিন আমি নিতে পারব না। হয়তো ফোন করেছি সেখানে উত্তর এসেছে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে। এগুলো মেনে নেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। হয়তো অনেকেই মানিয়ে নিয়ে টিকে যান। আমি সেটা পারব না। আমাকে ছবিটা করতে হবে, আর সেটা আমি যেভাবে চাইছি সেভাবেই করতে হবে। আরও অনেক ছবি করতে চাই আমি, আরও ভালো ছবি করতে চাই। সেটা করতে গেলে অর্থনৈতিক দিক থেকে নিশ্চিন্ত থাকাটা জরুরি।
‘নীহারিকা‘র পরে ২০২৩-এ তুমি ‘গাজনের ধুলোবালি‘ নিয়ে কাজ করছিলে, সেটা পিছিয়ে গিয়ে ‘গুডবাই মাউন্টেন‘ এগিয়ে এল কীভাবে?
ইন্দ্রাশিস: না, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়। ২০২২ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে আমি তিনটে ছবির কাজ করেছি। ‘নীহারিকা’, ‘গুডবাই মাউন্টেন’ আর তারপর ‘গাজনের ধুলোবালি’। ওটা একটু বড় স্কেলের ছবি। পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ চলছে। ওটা হয়তো আগামী বছর আসবে। এই ছবিটা ওর আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন: সিনেমা নয়, বাস্তব মাতৃত্বের হরেক রূপ ফুটিয়ে তুলবে ‘ডিয়ার মা’
২০২১ সালে পরিচালক অর্জুন দত্ত, শিলাদিত্য মৌলিক আর তুমি মিলে ‘থ্রি কোর্স মিল‘ নামে একটা ছবি করেছিলে। ছবিটা মুক্তি পেল না কেন?
ইন্দ্রাশিস: কারণটা আমারও জানা নেই। হিন্দিতে একটা অ্যান্থলজি ছবি ছিল ওটা। কিন্তু প্রযোজকরা কেন ওটাকে মুক্তি দিলেন না আমি জানি না। ওটা ওটিটিতে দেওয়ার কথা হয়েছিল। হল রিলিজের পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু কেন মুক্তি পেল না সেটা জানতে পারিনি।
আগামী দিনে ছবি নিয়ে কী ভাবনা রয়েছে? যে ধরনের আরবান ছবি এখন চলছে সেরকম কিছু বা বাণিজ্যিক ছবি বানাতে ইচ্ছে করে না? পরিচালক হিসেবে সব ধরনের দর্শকের কথা কি তাহলে ইন্দ্রাশিস আচার্য ভাবেন না?
ইন্দ্রাশিস: আমি সব ছবিকেই বাণিজ্যিক ছবি বলি। বাণিজ্য না থাকলে তো কাজগুলোই হতো না। তবে বাণিজ্যিক মানেই সেটা অবাস্তব কিছু হতে হবে সেটা আমি মনে করি না। না, হয়তো সব ধরনের দর্শকের জন্য আমি ছবি করতে পারব না, কারণ আমি সেরকম ছবি করি না। তবে আমার একটা বিরাট সংখ্যক দর্শক আছেন সেটা আমি জানি। তাঁদের কাছে আমাকে পৌঁছতে হবে, সেটাই আমার লক্ষ থাকে। সেই বাজেটেই ছবি করি যেটা প্রযোজককে ফিরিয়ে দিতে পারব। আমার ছবি থিয়েটারে বা স্যাটেলাইটে সব জায়গাতেই বিক্রি হয়েছে। কাজেই টাকা উঠছে না তেমনটা একেবারেই নয়।
বহু পরিচালক আছেন যারা এই মুহূর্তে বড় প্রযোজনা সংস্থার ভেতরে থেকে তাদের ফরমায়েশি ছবি করছেন আবার সঙ্গে নিজের পছন্দের ছবিটাও করছেন। তাতে করে তাদের একটা নিজস্ব দর্শক তৈরি হচ্ছে। ফরমায়েশি ছবিতে কাস্টিং বা অন্য ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা আপোষ করতে হয়। এরকমভাবে কাজ করার কথা কখনও ভেবেছ?
ইন্দ্রাশিস: মশলা ছাড়াও বাণিজ্যিক ছবি বানানো যায় বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত রুচির বাইরে গিয়ে আমি ছবি করতে পারব না। তবে এমন কোনও প্রস্তাব আমার কাছে আসেনি কখনও। নানা বিষয়ের ছবি নিয়ে আলোচনা তো হতেই পারে। সেখানে কাস্টিং বা অন্যান্য সিদ্ধান্ত গল্পের প্রয়োজন বুঝেই হবে। কিন্তু তেমন কোনও প্রযোজনা সংস্থার থেকে আমি কখনও উৎসাহ পাইনি।
নিজেকে কি ইন্ডাস্ট্রির আউটসাইডার মনে হয় কখনও?
ইন্দ্রাশিস: আউটসাইডার নাকি ইনসাইডার সেটা তো ইন্ডাস্ট্রির মানুষ বলবেন। তবে আমার কথা শুনবেন এমন কাউকে আমি পাইনি। এখানকার ইকোসিস্টেমটাই হয়তো বুঝতে পারিনি আমি।
যদি বড় প্রযোজনা সংস্থা থেকে ডাক আসে সেখানে তাদের পছন্দের সঙ্গে আপোষ করতে হতে পারে তো
ইন্দ্রাশিস: আলোচনা করতে আমি সবসময় রাজি। প্রযোজনা সংস্থা নিশ্চয়ই একটা ভালো ছবিই বানাতে চাইবেন। কাজেই সেখানে আমার সঙ্গে বিরোধ হবে এমনটা আমি ভাবি না। আপোষের কথা আসবে কেন। আমার যেমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে তেমন তাঁদেরও একটা দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতা আছে। কাজেই আলোচনার জায়গাটা অবশ্যই থাকছে। আমি যেমন তাঁদের কথাটা শুনতে চাইব তাঁরাও নিশ্চয়ই আমার ভাবনাটা বুঝবেন। আমি সব ধরনের ছবিই করতে চাই। তবে সেটা আমার মতো করেই করব।
সেই সম্পর্ক স্থাপনের জায়গাটা কি তুমিই গড়ে তুলতে পারনি নাকি তুমি হাত বাড়ানো সত্বেও ওদিক থেকে কেউ হাতটা ধরেনি?
ইন্দ্রাশিস: আমি হাত বাড়িয়েছিলাম। কেন জানি না কেউ হাতটা ধরল না। আমি কিন্তু খুব বন্ধুত্বপূর্ণ টিমওয়ার্কে বিশ্বাসী। আমার সঙ্গে কেউ ভালো ব্যবহার করলে আমি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি এমন কখনও হয়নি। এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচুর বন্ধু আছে আমার। যারা আমার সঙ্গে মিশেছেন তারা কিন্তু আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছেন। তবু কোথায় সমস্যা হচ্ছে আমারও জানা নেই।
