কলের গান থেকে রীলস্ — বাঙালির গান শোনার বিবর্তনের গল্প

RBN News Desk : প্রতি বছর ১৮ জুলাই পালিত হয় ‘বিশ্ব শ্রবণ দিবস’। এ বছরের World Listening Day -এর প্রধান থিম ছিল ‘Listening as a practice’। বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘শ্রবণ বা শোনা একটি চর্চা’। বিশ্বব্যাপী শোনার গুরুত্ব, শব্দ পরিবেশ (Acoustic Ecology) এবং পরিবেশের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে ১৮ জুলাই দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব শ্রবণ দিবসের প্রাক্কালে গত ১৭ জুলাই কলকাতায় ২৪ নম্বর অশ্বিনী দত্ত রোডে অবস্থিত সাহিত্য – সংস্কৃতির পীঠস্থান শরৎচন্দ্র বাসভবনে শরৎ সমিতির উদ্যোগে বিশেষ আলোচনামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার বিষয় ছিল ‘কলের গান থেকে রীলস্ — বাঙালির গান শোনার বিবর্তনের গল্প’। অনুষ্ঠানটির ভাবনা ও সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীতশিল্পী,গবেষক ও ছায়ানট (কলকাতা) – এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিক। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় তথ্যসমৃদ্ধ এক সন্ধ্যার সাক্ষী রইলেন কলকাতার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামমোহন লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রি রিডিং রুম – এর সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র, বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রাহক পরমানন্দ চৌধুরী, মনো বিশ্লেষক ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিহান মিউজিকের অন্যতম কর্ণধার নীলাদ্রি দেব ভট্টাচার্য্য। চার জন বক্তা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেন।  

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সোমঋতা বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর লেখা ‘বাঙালির কলের গান’ বই থেকে কয়েকটি লাইন পড়ে শোনান, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ — “গ্রামোফোন, বাঙালির কাছে যার ডাক নাম ‘কলের গান’ — সেই চাকতি-ঘোরানো যন্ত্রের গানের যুগের অবসান হয়েছে বেশ কয়েক দশক আগেই। কলের গান আজ স্মৃতি ও শ্রুতির অন্তর্গত। অথচ গত শতকের গোড়া থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্তও কলের গানের অস্তিত্ব ছিল। এক সময় বাঙালির বিনোদনের খুব প্রিয় উপকরণ ছিল গ্রামোফোন। বাঙালির জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল গ্রামোফোন-সংস্কৃতি।
কেবল শহরে নয়, গ্রামে-গঞ্জেও পৌঁছে গিয়েছিল গ্রামোফোনের সুরের ধারা।…বিদেশিদের সৌজন্যে গ্রামোফোনের চল শুরু হলেও বাঙালিরাও পিছিয়ে থাকেননি — তাঁরাও গ্রামোফোনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন পর্যায়ক্রমে গ্রামোফোন-যন্ত্র ও রেকর্ড বিক্রি, গ্রামোফোন-যন্ত্র সংযোজন ও তৈরি এবং গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরির ভেতর দিয়ে। এর পেছনে যে শুধু ব্যবসার হাতছানিই ছিল তা নয়, একধরনের স্বদেশি-চেতনাও যুক্ত হয়েছিল। অল্পদিনেই বাঙালির হাতে এই ব্যবসার প্রসার ঘটে।…জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠের গান ও যন্ত্রের সংগতের পাশাপাশি এই রেকর্ড তৈরিকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পী ও কলাকুশলীরও আবির্ভাব ঘটে। বাংলা গানের ভুবন হয়ে ওঠে তরঙ্গ মুখর। সে ছিল বাংলা গানের এক স্বর্ণ যুগ।” 
স্বর্ণযুগের অবসান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কলকাতায় এখনও সঙ্গীতপ্রেমীরা রামমোহন লাইব্রেরির রায়া দেবনাথ হলে প্রতি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার একত্রিত হন এই কলের গান শোনার আশায়। এই সম্পর্কে আলোকপাত করেন রামমোহন লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রি রিডিং রুম – এর সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র। জানা যায়, তাঁদের সংগ্রহে আছে প্রায় ৫০০০ গ্রামোফোন রেকর্ড। সেই সংগ্রহ থেকেই শ্রোতাদের অনুরোধে নির্বাচিত গান পরিবেশিত হয় গান শোনার আসরে। প্রবীনদের পাশাপাশি নবীনরাও সাগ্রহে আসেন কলের গান শুনতে। 
বক্তাদের আলোচনার পাশাপাশি সোমঋতা অনুষ্ঠানে সংযোজন করেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর লেখা থেকেই তিনি পাঠ করেন — ‘গ্রামোফোন কোম্পানি’ ১৯০২ সালে ভারতে স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠের গান ও যন্ত্রীদের বাজনা রেকর্ডের জন্য বিলেত থেকে ফ্রেডরিক উইলিয়াম গেইসবার্গ ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে ভারতে পাঠান। গেইসবার্গ আর তাঁর সঙ্গীরা ওই বছরের ২৮ অক্টোবর কলকাতায় এসে পৌঁছান। সময় নষ্ট করেননি গেইসবার্গ, পৌঁছানোর মাত্র এগারো দিনের মাথায় অর্থাৎ ৮ নভেম্বর প্রথম বাঙালি শিল্পীর বাংলা গান রেকর্ড। ‘কাঁহা জীবনধন’ — এই কীর্তনটি গেয়েছিলেন ক্ল্যাসিক থিয়েটারের চতুর্দশী নর্তকী মিস শশীমুখী। এই যাত্রায় গেইসবার্গের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার নিঃসন্দেহে কিন্নরকণ্ঠী গওহরজান। ১১ নভেম্বর গেইসবার্গ গওহরজানের কণ্ঠে হিন্দুস্থানি ভাষায় গান ধারণ করেন রেকর্ডে। গেইসবার্গ- ধারণকৃত তাঁর প্রথম বাংলা গান হল ‘ভালবাসিবে বলে ভালোবাসিনে’। এই পর্যায়ে নামকরা গাইয়েদের মধ্যে লালচাঁদ বড়ালের গানও রেকর্ড করা হয়। গেইসবার্গ কলকাতার থিয়েটার পাড়া আর বেশ্যা-বাইজির আসরে-বাসরে ঘুরে বেশ কিছু কণ্ঠ ও যন্ত্রশিল্পী আবিষ্কারে সফল হন।” এভাবেই রেকর্ডিং শুরু হল কলকাতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানিতে কীভাবে তাঁর কবিতা রেকর্ড করেছিলেন, সেই গল্পও সোমঋতার হাত ধরে উঠে আসে এই সন্ধ্যায়। বিশিষ্ট সংগ্রাহক পরমানন্দ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে শোনানো হয় রবীন্দ্র-প্রয়াণে রচিত কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গান ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’, নজরুলের কণ্ঠে এই গান শুনতে পেয়ে শ্রোতারা আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়েন।
বিহান মিউজিকের অন্যতম কর্ণধার নীলাদ্রি দেব ভট্টাচার্য্যের বক্তব্যে শোনা যায় হতাশার সুর। ২০০৩ সালে তাঁদের পথ চলা শুরু। ক্যাসেট, সিডির দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সুস্থ সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে এই সংকটময় সময়ে তাঁদের লড়াই চলছে। আবুল আহসান তাঁর বইতে যে প্রশ্ন রেখেছেন, নীলাদ্রির কথায় অনেকটা সেই সুরই ধ্বনিত হয়েছে — “নতুন চিন্তার কারণে, প্রয়োজনের গরজে ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনে যুগ পাল্টায় — মনের রূপান্তর ঘটে — রুচির ধারা বদলে যায়। কলের গানের বিলুপ্তিও এই পথ ধরেই ঘটেছে। একদিন যা সত্য ছিল, তা আজ স্মৃতি, আবার আগামীকাল তা হয়তো কেবলই শ্রুতি। কলের গানের সৌজন্যে যাঁদের কণ্ঠের গান একদিন মানুষকে আনন্দ দিয়েছে — আবেগের স্পর্শে শিহরণ জাগিয়েছে, দু’চারজন বাদে তাঁরা আজ প্রায় সকলেই বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে যাঁদের যত্নে-আয়োজনে গোল কৃষ্ণ-চাকতির ভেতর দিয়ে এই গান পৌঁছে যেত মানুষের কাছে, তাঁদের কথাও কেউ আর মনে রাখেননি। কতো স্বপ্ন নিয়ে — সংগ্রাম করে — শ্রম দিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন এক একটি প্রতিষ্ঠান — তারও আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই — ধূসর হয়ে গিয়েছে সেইসব প্রয়াসের কথা। কিন্তু বাঙালির সংগীত-সংস্কৃতির একটি মহান অধ্যায়ের কথা চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে এই বেদনা কি কাউকে ভারাক্রান্ত ও বিধুর করে তোলে না?” 
মনো বিশ্লেষক ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকার আলোচনার মাধ্যমে শ্রোতাদের বেশ কিছু বিষয়ে অবগত করেন। শোনার অভ্যাস কীভাবে কমে যাচ্ছে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে শোনার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, কীভাবে শোনার অভ্যাস বাড়াতে হবে — এই প্রসঙ্গে তাঁর তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা এই সন্ধ্যায় পরম পাওয়া। বিশ্ব শ্রবণ দিবসের প্রাক্কালে ভালো শ্রোতা হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ধৈর্য্যচ্যুতি না ঘটিয়ে অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষটির ভরসাস্থল হয়ে উঠতে পারি। শুধুমাত্র নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বক্তাদের ইতিবাচক কথাও এই সন্ধ্যার পরম প্রাপ্তি। সঙ্গে অবশ্যই বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনার দুর্লভ সুযোগ।
ছবি সৌজন্য : ছায়ানট (কলকাতা)

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *