‘বড় চরিত্রে অভিনয় করার মতো সময় দিতে পারতাম না’

আগামী মার্চে একানব্বই হবে তাঁর। স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা এখন আর তেমন মনে করতে না পারলেও, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে সামনে থেকে দেখার স্মৃতি এখনও স্পষ্ট। মৃণাল সেনের ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবি দিয়ে কেরিয়ার শুরু করলেও, তারও আগে একটা সময়ে মঞ্চে মহিলা চরিত্রে অভিনয় করতেন মনু মুখোপাধ্যায়। আজ এই নবতিপর বয়সেও অভিনয় করছেন নতুন ছবিতে। রেডিওবাংলানেট-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর মছলিবাবা জানালেন তাঁর জীবনের নানান অজানা কথা।  

আপনার আসল নাম তো সৌরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সেই নামটা অভিনয় জীবনে ব্যবহার করলেন না কেন?

মনু আমার ডাকনাম। শুরু থেকে ওই নামটাই চলে এসেছে। আমি যখন সরকারী চাকরি করতাম তখন ভালো নামটা ব্যবহার হত। পরে যখন অভিনয়ে আসি, তখন ডাকনামটাই নাটকে ব্যবহার করতাম। পরে সিনেমাতেও ওটাই চলে এসেছে।




আপনার জন্ম ১৯৩০ সালে। অর্থাৎ স্বাধীনতা আন্দোলন আপনি নিজের চোখে দেখেছেন। সেসব দিনের কথা মনে আছে এখনও?

না, এখন আর খুব একটা মনে নেই। তবে নেতাজীকে দেখেছিলাম, সেটা মনে আছে। তখন আমরা টালায় থাকতাম। সেখানে একটা পার্কে নেতাজী বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। তখন ওঁকে দেখেছিলাম। আমার বয়স তখন বারো-তেরো হবে।

সরকারী চাকরি করতে করতে অভিনয়ে এলেন কিভাবে?

চাকরির আগে থেকেই মাথায় অভিনয় ঢুকে গিয়েছিল। বিশ্বরূপায় পেশাদারী থিয়েটারে অভিনয় করে আমার জীবন শুরু হয় বলা যেতে পারে। কাজ শুরু করি মহিলা চরিত্রে অভিনয় দিয়ে। তখন নাটকে মহিলারা আসতেন না। পুরুষরাই মহিলাদের চরিত্রে অভিনয় করতেন। আমার শুরুটাও সেরকমভাবেই হয়েছিল। আমি প্রথম অভিনয় করি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’ নাটকে সত্যবতীর চরিত্রে। শুরুতে আমি প্রম্পটার হিসেবে বিশ্বরূপায় কাজ করতাম। আসলে আমি এত রোগা ছিলাম সেই সময় যে আমাকে বলা হয়েছিল এই চেহারায় অভিনয় করা যায় না। আমি ভেবেছিলাম শুরুটা তো করি, তারপর সুযোগ পেলে দেখিয়ে দেব কি হয় না হয়। তারপর ‘আরোগ্য নিকেতন’ নাটকে একটা সুযোগ আসে। ওই নাটকে কমলা ঝরিয়া নামে তখনকার দিনের এক নামী গায়িকার সঙ্গে সনৎ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একটি ছেলে গান গাইতো। একদিন সনৎ অনুপস্থিত থাকায় আমি সুযোগ পেয়ে যাই ওই গানে।

আরও পড়ুন: সংলাপ মুখস্থ বলতে পারলেই ধারাবাহিকে কাজ পাওয়া যায়: অনামিকা

নাটক থেকে ছবির জগতে এলেন কিভাবে?

‘আরোগ্য নিকেতন’-এ তখন নীতিশ মুখোপাধ্যায়, শান্তি গুপ্তার মতো বড় বড় শিল্পীরা কাজ করছেন। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন পরিচালক। তখন বসন্ত চৌধুরী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়রাও নিয়মিত নাটক করছেন বিশ্বরূপায়। কালীদা একদিন আমাকে নিয়ে গেলেন ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবির জন্য মৃণালদার কাছে। স্মৃতিলেখা বিশ্বাসের সঙ্গে একটা ছোট্ট সিনে আমি ছিলাম। সেটাই আমার প্রথম ছবি। আর সেই থেকে আমার যেন নেশা ধরে গেল। যেভাবে হোক ছবিতে কাজ করতেই হবে। তখন আমি হাইকোর্টে চাকরি করি। সেই চাকরি আবার পেয়েছিলাম ফুটবল খেলার সুবাদে। প্রথম জীবনে প্রচুর ফুটবল খেলেছি।

একের পর এক চরিত্রে আপনাকে দেখা গেছে। সেই সময় কোন পরিচালকের ছবিতে সবথেকে বেশি কাজ করেছেন?

তরুণ মজুমদার ওঁর প্রচুর ছবিতে আমাকে কাজ দিয়েছেন। ছোট ছোট বিভিন্ন চরিত্রে আমার চেহারায় নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করতেন উনি। ওঁর প্রায় প্রতি ছবিতেই কোনও না কোনও চরিত্র করেছি আমি। আমাকে দিয়ে বিভিন্ন রকমের চরিত্র করিয়ে নিতেন উনি। কোথায় আমাকে মানাবে নিজেই বুঝে নিতেন।

আরও পড়ুন: পুজোয় রবীন্দ্র সদনে বাংলা ছবি, সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের

‘উত্তরায়ণ’ ছবিতে আপনি উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?

উত্তমকুমারের কথা বলার আগে বলতে হয় তরুণকুমার বা বুড়োর কথা। আমার সঙ্গে বুড়োর আলাপটা খুব অদ্ভুতভাবে হয়েছিল। ওরা তখন গৌতমের (উত্তমকুমারের ছেলে) চুল দিতে তারকেশ্বরে যাচ্ছে, আর আমিও যাচ্ছিলাম আমার মেয়ের চুল দিতে। ওখানে গিয়ে আলাপ হয়ে গেল। এরপর তরুণকুমার বিশ্বরূপায় যোগ দিলেন, আর আমার সঙ্গেও খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল। এমন অনেকবার হয়েছে গেছে যে আমি সকালে ওদের ভবানিপুরের বাড়ীতে গিয়ে আড্ডা দিয়েছি, তারপর জ্যেঠিমা (উত্তমকুমারের মা) আর গৌরিবৌদির (উত্তমকুমারের স্ত্রী) কাছে খেয়ে হাইকোর্টে চলে গেছি। উত্তমকুমারকে তাই খুব কাছ থেকেই দেখেছি। দাদার যেখানেই শ্যুটিং থাকুক না কেন, সকালে জ্যেঠিমাকে প্রণাম করে যেতেন। সেখানেই দেখা হয়ে যেত, খুব স্নেহ করতেন।

আপনার করা অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর মছলিবাবা। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ হলো আর এই চরিত্রের জন্য আপনি কিভাবে নির্বাচিত হলেন?

তখন আমি মিনার্ভাতে ‘প্রজাপতি’ নাটকে অভিনয় করছি। প্রম্পটার নই আর, পুরোদস্তুর অভিনেতা। কালীদা বলেছিলেন ‘ওরে প্রম্পটিং ছেড়ে দে এবার, নাহলে তোর কিছু হবে না।’ তাই সে কাজ ছেড়ে দিলাম। বিশ্বরূপায় ‘ক্ষুধা’ নাটকে কালীদা নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন। সেখানে তরুণকুমার, বসন্ত চৌধুরী এরা সবাই অভিনয় করতেন। কালীদা অনুপস্থিত থাকায় আমি তিন-চার রাত ওঁর চরিত্রে পরিবর্ত অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছিলাম। কিন্তু ছুটি নিয়ে একবার ওদের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ায় আমি বিশ্বরূপা ছেড়ে দিই। সেই সময় মিনার্ভাতে নিয়মিত কাজ করছি। একদিন সত্যজিতের সহকারী পূর্ণেন্দু বোস আমাকে ফোন করলেন। বললেন, ‘কাল আপনাকে মানিকদা দেখা করতে বলেছেন ওনার বাড়িতে।’ বলা হলো, আমাকে নাকি দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে অনেকটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো দেখতে লাগবে। আমি তো শুনে অবাক। সেইভাবে আমি মছলিবাবার চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হলাম। এছাড়া ওঁর ‘অশনি সংকেত’ ছবিতেও একটা সিনে অভিনয় করেছিলাম।

আরও পড়ুন: আবারও পাঁচে ‘শ্রীময়ী’

কেমন ছিল সত্যজিতের ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা? আপনার চরিত্রটা কি উনি নিজে করে দেখিয়ে দিতেন?  

উনি এক অন্য ধরণের মানুষ ছিলেন। আমার কাছে ভগবানের মতো। কাজ পছন্দ হলে কিছুই বলতেন না। বলতেন তোমার মতো করে করো। আর থিয়েটার করেছি বলে চরিত্র বুঝে নিতে আমার অসুবিধা হতো না। তবে কোথাও যদি মনে হতো, তাহলে উনি নিজে সেটা করে দেখিয়ে দিতেন। মছলিবাবর চরিত্রে সংলাপ খুব কম ছিল, একটাই সিনে। কিন্তু অভিনয় ছিল অনেকটা। আমি আমার মতো করেই করেছিলাম। উনি প্রথমে যেভাবে বুঝিয়েছিলেন তাতে অসুবিধা হয়নি বুঝতে।

ছবিতে আপনাকে সেভাবে কখনও বড় চরিত্রে দেখা যায়নি। কেন?

বড় চরিত্রে অভিনয় করার মতো সময়টা আমি দিতে পারতাম না। তখন বিয়ে করেছি, দুই মেয়ে হয়েছে। তাই সাহস করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে অভিনয়ে মন দিতে পারিনি আমি। তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, আমার যা গলা ও অভিনয় ক্ষমতা তাই নিয়ে বম্বে (মুম্বই) যেতে পারলে অনেক ভালো চরিত্র পেতে পারতাম। কিন্তু সেই সাহসটা আমার পক্ষে দেখানো সম্ভব ছিল না। পরিবারের দায়িত্ব আমার কাছে বেশি জরুরী ছিল। আসলে দু নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না, এটা আমি মানতাম।

আরও পড়ুন: ‘সোনার কেল্লা’র গল্প নিয়ে মুক্তি পেল ‘অচেনা মানিক’

ফুটবল খেলার সূত্রে চাকরি হয় বলছিলেন। ফুটবল নিয়ে কেরিয়ার তৈরি করার কথা ভাবেননি কখনও?

না। সেটা সম্ভব ছিল না কারণ ফুটবল খেলতে গিয়ে আমার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। তখন আমার ১৯ বছর বয়স। তাই ওটা নিয়ে আর বেশিদূর এগোনো হয়নি। আর আমি নাটকে মহিলার রোল করতাম আরও কম বয়স থেকে। তাই ওই নেশাটাও কম ছিল না।

অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে আপনি মৃণাল, সত্যজিৎ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণবাবুর সঙ্গে কাজ করেছেন। পরে আবার অপর্ণা সেন, রাজা সেন এদের ছবিতেও অভিনয় করেছেন। কোনও তফাত বুঝতেন কি?

অবশ্যই তফাত আছে। কি তফাত সেটা বলা যাবে না এখন আর, তবে সেটা নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু অসুবিধা কখনও হয়নি কেন না আমি থিয়েটারে বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করেছি সারাজীবন ধরে। নিজের চরিত্র ছাড়াও অনেক বড় বড় সাবস্টিটিউট রোল করেছি, এমন কি জহর রায়েরও। কোনও এমার্জেন্সি হলে আমার বড় রোলে ডাক পড়তো। তাই কখনওই কোনও চরিত্র করতে আমার ভয় হয়নি। যখন যেমন চরিত্র এসেছে সেটাই করেছি।

আপনার পরেরদিকের ছবিগুলোর মধ্যে ‘পাতালঘর’-এ অপয়ার চরিত্রটি আইকনিক বলা চলে। কিভাবে গড়েছিলেন চরিত্রটাকে?

‘পাতালঘর’-এর পরিচালক অভিজিৎ চৌধুরী ছিল বম্বের লোক। আমার কোন ছবি দেখে ওরা আমাকে  সিলেক্ট করেছিল জানি না। আমাকে বলা হলো, এই চরিত্রটা আপনাকে করতেই হবে। কিন্তু সেই সময় আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি। ওরা সেই কারণে ওদের কাজ বন্ধ করে দিল। আমাকে বললো, ‘আমরা এখন অন্য প্রোজেক্ট করছি। আপনি সুস্থ না হওয়া অবধি ‘পাতালঘর’-এর কাজ বন্ধ থাকবে।’ আর সেটাই করলো। মাসখানেক পরে আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম, তারপর বোলপুর গেলাম শ্যুটিং করতে। অভিনয় করতে গিয়ে আমার মনে হলো, যদি একটু তাড়াতাড়ি সংলাপ বলা যায় তাহলে হয়তো চরিত্রটাকে আরো ভালো ফুটিয়ে তোলা যাবে। আমি সেটা করে দেখাতে ওদেরও পছন্দ হলো। সেটাই দর্শকদের ভালো লেগে গেল।

আরও পড়ুন: পুরোনো প্রথায় ফিরতে চেয়ে ইমনের নতুন গান

কিছুদিন আগে ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে একটি ওয়েব সিরিজ়ে ‘মাকরশার রস’ গল্পে আপনাকে নন্দদুলালবাবুর চরিত্রে দেখা গেল। কেমন লেগেছিল সেটা করতে?

অন্যরকম চরিত্র ছিল ওটা। ভালো লেগেছিল। আমি নিজের মতো করেই করেছি, ওরা দেখে বললো এভাবেই করবেন। এভাবেই বরাবর নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছি চরিত্রকে। নাটকের অভিনেতা হওয়ায় এই একটা ব্যাপারে আমার কখনও আটকায়নি।

এখনও তো ছবি করছেন। সম্প্রতি তথাগত মুখোপাধ্যায়ের ‘ভটভটি’র জন্য শ্যুটিং করলেন। নব্বইতে এসে এখনও এত এনার্জি পান কি করে?

আসলে আমার কাজ করতে ভালো লাগে। তবে সিরিয়ালের কাজ করি না আর। খুব ধকল যায়। মাঝে মাঝে ফিচার ছবির কাজ করি। মাঝে দু’বছর অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম, তার আগে অনেক কাজ করতাম। কিন্তু এখন আর সাহস পাই না জানো। ছোট রোল পেলে করি। ‘ভটভটি’তে আমার অল্পই কাজ, তাও এক জায়গায় বসে, পাড়ার এক বুড়োর চরিত্র। তাই এটা করলাম। ভালো লেগেছিল গল্পটা। এভাবেই যতদিন পারব কাজ করে যাব।

Amazon Obhijaan



Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

Swati

Editor of a popular Bengali web-magazine. Writer, travel freak, nature addict, music lover, foody, crazy about hill stations and a dancer by passion. Burns the midnight oil to pen her prose. Also a poetry enthusiast.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *