‘এমন একজনও কেউ নেই যে ডেকে জিজ্ঞেস করবে, কি রে খেয়েছিস?’

পরিচালক রণদীপ সরকারের ছবি নূপুর-এ বড় পর্দায় ফিরছেন দেবিকা মুখোপাধ্যায় । তার আগে একান্ত সাক্ষাৎকারে রেডিওবাংলানেট-কে জানালেন শীর্ষ পরিচালকদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং কেন এই লম্বা বিরতি।

অনেকদিন পর বড় পর্দায় ফিরছেন আপনি

ফিরছি মানে? আমি তো যাইনি কোথাও (হেসে)। ছিলাম সবসময়।

কিন্তু ছবি তো করেননি

না, তা করিনি।

সেটার কারণ কি? ছবির অফার আসেনি, নাকি চিত্রনাট্য পছন্দ হয়নি?

অফার যে আসেনি তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমার চিত্রনাট্য পছন্দ হয়নি। তাছাড়া আমি কোনওদিনই কারোর কাছে গিয়ে, ‘আমাকে কাজ দিন,’ এরকম দাবী করিনি। সেটা আমি পারি না। আমার পিআর ভালো নয়। যে সব পরিচালকদের সাথে কাজ করেছি, তারা সবাই আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। তারা মনে করেছেন এই চরিত্রটার জন্য দেবিকাই সবথেকে উপযুক্ত। তাই ডেকেছেন আমাকে।

তৈরি হল না যে ঘরে বাইরে

রণদীপের ছবিতে কাজ করতে রাজি হলেন কেন?

রণদীপের সাথে এটাই আমার প্রথম কাজ নয়। ওর প্রথম ছবি উনিশে এপ্রিল-এও অভিনয় করেছি আমি, অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটা চরিত্রে। যে কোনও কারণেই হোক, ছবিটা এখনও রিলিজ় করেনি। করবে আশা রাখি। সেই অর্থে নূপুর ওর তৃতীয় ছবি। রণদীপের যেটা সবথেকে ভালো লাগে, ও নিজেকে রিপিট করে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধাঁচের ছবি বানায় না। ওর বিষয় ভাবনায় বৈচিত্র্য আছে। মনের মত গল্প না পেলে, জোর করে ছবি বানায় না। প্রযোজক চাইছে, তাই যেমন করে হোক পয়সা নিয়ে ছবিটা ঘাড় থেকে নামিয়ে দিলাম, এরকম পরিচালক ও নয়। এই ছবিটার মুখ্য দুই চরিত্র—বংশী ও নূপুর—এরা মূক ও বধির। সুতরাং গল্পে অভিনবত্ব আছে সেটা বোঝাই যাচ্ছে। এসব কারণেই রাজি হলাম।

নূপুর-এ আপনার চরিত্রটি কি?

আমি নূপুরের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছি।

গান শেষ আর জান শেষ তো একই কথা রাজামশাই

বাংলায় তো আপনি প্রথম সারির সব পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন

একদম। তপন সিংহ, মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অঞ্জন চৌধুরী, আরও অনেকের সাথেই কাজ করেছি। মুম্বইয়ে অমল পালেকরের ছবিতে অভিনয় করেছি। দারুণ সব অভিজ্ঞতা।

তপন সিংহ ও অঞ্জন চৌধুরী তো দুই বিপরীত ঘরানার পরিচালক। এদের কাজের মধ্যে মিল বা অমিল কোথায়?

আমরা যারা অভিনয় করি, তাঁরা একতাল মাটির মত। পরিচালক যেভাবে গড়ে নেবেন, আমরা সেইভাবেই অভিনয় করব। যাঁর ছবিতেই অভিনয় করি না কেন, তিনি যেমন চাইছেন, আমাকে ঠিক তেমনটাই করতে হবে। সেটা করতে পারব, এই ভরসা থেকেই তো সেই পরিচালক আমাকে নিয়েছেন, তাই না? অঞ্জনদা সংলাপ-নির্ভর ছবি করতেন, সংলাপের মধ্য দিয়ে গল্পটা বলতেন। তপনবাবুর ছবি খুব লিরিকাল হতো। একটা সুন্দর ফ্লো থাকত ন্যারেটিভে। দুজনেই শিল্পীদের সেরাটা বার করে নিতে পারতেন। এবং সবথেকে বড় কথা, এই সব পরিচালক শিল্পীদের মর্যাদা দিতেন, সম্মান করতে জানতেন। রণদীপের মধ্যে এটা আছে। আর ও জানে কাকে দিয়ে কোন কাজটা হবে। এটাও যে কোনও পরিচালকের একটা বড় গুণ হওয়া উচিৎ।

Advertisement

সেই মর্যাদার জায়গাটার অভাব বোধ করেন কি এখন?

হ্যাঁ। কোথাও যেন একটা অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়ে গেছে ইন্ডাস্ট্রিতে। কিছু অভিনেতা/অভিনেত্রীকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, এই কাজটা একে দিয়ে হবে না। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পীকেই সব ছবিতে দেখা যাচ্ছে। এবং একটা পর্যায়ের পর দর্শকের বিরক্ত লাগছে সেই একই মুখ, একই ধরণের অভিনয় বারবার দেখতে।

আশি বা নব্বইয়ের দশকের থেকে এখন তো অনেক বেশি ছবি তৈরি হয়। কিন্তু আবার হলের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এতই যদি ছবি তৈরি হয়, তাহলে হলের সংখ্যা কমছে কেন?

একটাই কারণ, গল্প। আজকাল ছবিতে গল্প থাকে না। আগে লোকে দলবেঁধে হলে ছবি দেখতে যেত, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা গল্প দেখতে পাবে বলে। এক একটা ছবি পাঁচ-ছয় মাস চলতই। প্রযোজকরা জানতেন এর মাঝে ছবি তৈরি করে কোনও লাভ নেই, কারণ হলই পাবেন না। তাঁরা সময় নিয়ে এমন গল্প নিয়ে ছবি করতেন, যাতে লোকে সেটা দেখে। আর এখন তো দু’সপ্তাহের বেশি কোনও ছবি চলেই না। পনেরো দিনের মধ্যে টেলিভিশন প্রিমিয়র হয়ে যায়। তাহলে যে ছবিটা একটু অপেক্ষা করলেই টিভিতে দেখতে পাব, সেটা দেখার জন্য আমি পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে, তেল পুড়িয়ে হলে যাব কেন? ছবির রিপিট ভ্যালু কমে গেছে, শেলফ্‌ লাইফ কমে গেছে। একটা ছবি একবার দেখার পর দ্বিতীয়বার দেখতে ইচ্ছে করে না। ছবি যদি হলে নাই চলল, তাহলে হল রেখে লাভ কি? এই কারণেই একের পর এক হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তাশি গাঁওয়ে একদিন

ইদানিং সবাই এরকম ছবি বানাচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

না, সেটা একবারও বলছি না। কিছু পরিচালকের ছবি নিশ্চয়ই চলছে এবং প্রযোজক, হলমালিক সেখান থেকে লাভও করছেন। তবে এটাও বোঝা দরকার, শুধু গল্প বলতে পারলেই হবে না। আমি গল্পটা কি ভাবে আমার দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করছি, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধুমাত্র দু-একজন পরিচালকের ছবি হলে চললেই তো হবে না। অনেক বেশি সংখ্যক পরিচালকের ছবি চলতে হবে। ছবি দেখিয়েই তো হলগুলো ব্যবসা করবে। হতাশার মত শোনালেও, বেশিরভাগ পরিচালকেরই এখন গল্প বলার মুন্সিয়ানা নেই।

মু্ম্বইতে কাজ করার কোনও অফার পাননি?

পেয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। করিনি।

রক্তবরণ মুগ্ধকরণ

কেন? মুম্বইতে কাজ করলে তো অনেক বেশি দর্শকের কাছে পোঁছতে পারতেন। তাছাড়া হিন্দী ছবির রোজগারের দিকটাও অস্বীকার করা যায় না

মুম্বই থেকে অফারগুলো যখন আমি পাই, তখন এখানেই আমার প্রচুর কাজ। অমলের ছবিতে যখন কাজ করেছি, তখন সকালের ফ্লাইটে গিয়ে সারাদিন কাজ করে আবার রাতে কলকাতায় ফিরে এসেছি। তাছাড়া মুম্বইতে কাজ করতে গেলে পাকাপাকিভাবে ওখানেই থাকতে হতো। মা’কে এখানে ছেড়ে সেটা আমার পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। আমি চাইওনি।

একটা কথা হামেশাই শোনা যায়, মুম্বই ভীষণই পেশাদার, সেখানে কলকাতা অনেক বেশি নন-ফর্মাল। এটা কতটা সত্যি?

একশো ভাগ সত্যি। মুম্বই সত্যিই পেশাদার। ওরা কাজ বোঝে। কাজের বাইরে তুমি কি করলে, না করলে, তাই নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই। অন্যদিকে টালিগঞ্জ স্টুডিয়োপাড়া একটা বিরাট পরিবারের মত ছিল। সবাই সবাইকে চিনত, খোঁজ নিত, সাধ্যমত সাহায্য করত একে অপরের। এমন অনেকদিন হয়েছে দু-তিনটে ইউনিটের লোকজন আমরা একসাথে বসে লাঞ্চ করেছি। বেণুদি (সুপ্রিয়া দেবী) হয়ত একদিন মোচার ঘন্ট রান্না করে এনেছেন। আমি সেদিন মাছের ঝোল নিয়ে গেছি। আমি ওঁকে বললাম, ‘বেণুদি, আমার রান্না তোমার মতন ভালো হবে না। কিন্তু তোমাকে খেয়ে দেখতেই হবে।’ সম্পর্কগুলোর মধ্যে একটা দাবীর জায়গা ছিল। অনেকেই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতেন, আমরা ভাগ করে খেতাম। এর মধ্যেই কাজ করতাম আমরা, একের পর এক সফল ছবি তৈরি হতো। দরুণ হৃদ্যতা ছিল সবার মধ্যে। আন্তরিকতা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল।

শব্দ যখন ছবি আঁকে

এই পরিবেশটা কি এখন মিস করেন?

ভীষণ। এখন এমন একজনও কেউ নেই যে ডেকে জিজ্ঞেস করবে, কি রে খেয়েছিস? কেউ কাউকে মনেই রাখে না। পল্লবী (চট্টোপাধ্যায়) খুব খেয়াল রাখত সবার। কে কেমন আছে ডেকে জিজ্ঞেস করত। এই মানুষগুলোওকেও আর দেখতে পাওয়া যায় না।

বড় পর্দায় আবারও কাজ করবেন তো?

ভালো চিত্রনাট্য, ভালো চরিত্র পেলে নিশ্চয়ই করব।

ছবি: গোপাল

Amazon Obhijaan

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
1

Prabuddha

Foodie, lazy, bookworm, and internet junkie. All in that order. Loves to floor the accelerator. Mad about the Himalayas and its trekking trails. Forester in past life. An avid swimmer. Also an occasional writer and editor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *